বক্সার বিদ্রোহে সম্রাজ্ঞী সিশির ভূমিকা: বিদ্রোহীদের পাশে কেন দাঁড়িয়েছিল চিং রাজবংশ?
Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস
- Author: Admin
- August 14, 2026
বক্সার বিদ্রোহে সম্রাজ্ঞী সিশির ভূমিকা
১৯০০ সালের বক্সার বিদ্রোহের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন চিং সাম্রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতাধর শাসক সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশি। প্রথমদিকে চিং প্রশাসন বক্সারদের বিপজ্জনক ও অবাধ্য শক্তি হিসেবে দেখলেও কয়েক মাসের মধ্যে রাজদরবারের একটি অংশ তাদের বিদেশিবিরোধী শক্তিকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ পর্যন্ত সিশির নেতৃত্বাধীন দরবার এমন এক অবস্থানে পৌঁছায়, যেখানে বক্সারদের দমন করার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে কার্যত সহযোগিতা করা হয় এবং ১৯০০ সালের জুনে বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত পরে চিং সাম্রাজ্যের জন্য বিপর্যয়কর প্রমাণিত হয়। বিদেশি বাহিনী বেইজিং দখল করে, রাজদরবার রাজধানী ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় এবং পরাজয়ের পর চীনকে ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকলের কঠোর শর্ত মেনে নিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সিশি কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? তিনি কি সত্যিই বক্সারদের বিশ্বাস করতেন, নাকি বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে তাদের সাময়িক রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন?
সিশির অবস্থান বুঝতে হলে প্রথমে চিং রাজদরবারের সেই সময়কার পরিস্থিতি দেখতে হয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে চীন একের পর এক বিদেশি শক্তির কাছে সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছিল। আফিম যুদ্ধ, অসম চুক্তি, বিদেশি বন্দর, মিশনারিদের বিশেষ অধিকার এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি প্রভাববলয় চিং সরকারের মর্যাদা দুর্বল করে দিয়েছিল। এর ওপর ১৮৯৪–১৮৯৫ সালের প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে পরাজয় ছিল বিশাল ধাক্কা।
বিশেষভাবে অপমানজনক ছিল এই সত্য যে কয়েক দশক আগেও তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে বিবেচিত জাপান আধুনিকায়নের মাধ্যমে এমন শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যা চীনের স্থল ও নৌবাহিনীকে সহজেই পরাজিত করতে সক্ষম হয়। এই পরাজয় চিং রাষ্ট্রযন্ত্রের অদক্ষতা প্রকাশ করে এবং সংস্কারের দাবি আরও জোরালো হয়।
১৮৯৮ সালে তরুণ গুয়াংশু সম্রাট দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেন। ইতিহাসে এই পর্ব “শত দিবসের সংস্কার” নামে পরিচিত। শিক্ষা, প্রশাসন, সামরিক ব্যবস্থা এবং অর্থনীতিকে আধুনিক করার উদ্দেশ্যে একের পর এক পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু সিশি ও রক্ষণশীল অভিজাতদের একটি বড় অংশ মনে করতেন এই দ্রুত সংস্কার সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামো এবং তাদের নিজেদের ক্ষমতার জন্য বিপজ্জনক।
অল্প সময়ের মধ্যেই সিশি হস্তক্ষেপ করেন। গুয়াংশু সম্রাট কার্যত গৃহবন্দি হন এবং সংস্কারের অনেক উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে রাজদরবারের ভেতরে সংস্কারপন্থী ও রক্ষণশীলদের সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বক্সার সংকট যখন শুরু হয়, তখন চিং দরবার ইতিমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং বিদেশি শক্তির প্রতি গভীরভাবে সন্দিহান ছিল।
বক্সার আন্দোলন প্রথমে শানতুং এবং উত্তর চীনের গ্রামীণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইহেচুয়ান নামে পরিচিত এই আন্দোলনের সদস্যরা বিদেশি শক্তি এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের বিরোধিতা করত। তাদের অনেকের মধ্যে প্রচলিত ধারণা ছিল যে বিদেশিরা চীনের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য ধ্বংস করছে।
চিং সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রথমদিকে বক্সারদের নিয়ে বিভক্ত ছিলেন। কেউ তাদের ডাকাত বা বিদ্রোহী হিসেবে দমন করতে চাইতেন। আবার কেউ মনে করতেন, আন্দোলনটি প্রকৃতপক্ষে চিং রাজবংশের বিরুদ্ধে নয়; বরং বিদেশিদের বিরুদ্ধে। এই দ্বিতীয় ধারণাটিই ধীরে ধীরে দরবারে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
বক্সারদের বহুল ব্যবহৃত একটি স্লোগানের মূল ভাব ছিল—“চিংকে সমর্থন করো, বিদেশিদের ধ্বংস করো।” এই বক্তব্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিং রাজবংশের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহের পরিবর্তে তারা নিজেদের সম্রাটের পক্ষে এবং বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছিল।
সিশির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছিল। যদি বক্সারদের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়, তাহলে হয়তো বিদেশি সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ কমানো সম্ভব হবে। চিং সরকারের দুর্বল সামরিক অবস্থার কারণে এমন একটি গণআন্দোলন কিছু রক্ষণশীল কর্মকর্তার কাছে অপ্রত্যাশিত সহযোগী হিসেবে দেখা দিতে শুরু করে।
কিন্তু সিশি শুরু থেকেই বক্সারদের নিঃশর্ত সমর্থক ছিলেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। তার নীতি ছিল দ্বিধাগ্রস্ত, পরিবর্তনশীল এবং পরিস্থিতিনির্ভর। বক্সারদের শক্তি বাড়তে থাকলে দরবারের একাংশ তাদের দমন করতে চাইছিল, অন্য অংশ উৎসাহ দিচ্ছিল। সিশি নিজেও একদিকে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন, আবার অন্যদিকে বিদেশিদের বিরুদ্ধে তাদের সম্ভাব্য ব্যবহার বিবেচনা করেছেন।
এখানে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষোভও ভূমিকা রেখেছিল। ১৮৯৮ সালের সংস্কার সংকটের পর বিদেশি শক্তিগুলোর অনেক প্রতিনিধি গুয়াংশু সম্রাট এবং সংস্কারপন্থীদের প্রতি তুলনামূলক সহানুভূতিশীল ছিলেন। সিশির আশঙ্কা ছিল, বিদেশিরা কোনো এক পর্যায়ে তার ক্ষমতা দুর্বল করে গুয়াংশুকে পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি কূটনৈতিক চাপকে সিশি শুধু চীনের সার্বভৌমত্বের হুমকি হিসেবে নয়, নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিও সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছিলেন। ফলে বিদেশিবিরোধী রক্ষণশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য তার কাছে ক্রমে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
১৮৯৯ সালের শেষ এবং ১৯০০ সালের শুরুতে বক্সাররা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। উত্তর চীনে গির্জা আক্রান্ত হয়, বিদেশি মিশনারি এবং চীনা খ্রিস্টানরা নিহত হন এবং রেলপথ ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়। পরিস্থিতি যখন বেইজিংয়ের দিকে এগিয়ে আসে, তখন বিদেশি দূতাবাসগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
বিদেশি শক্তিগুলো তাদের দূতাবাস রক্ষার জন্য সেনা পাঠাতে শুরু করলে চিং দরবার এটিকে নতুন সামরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতে থাকে। বিদেশি সৈন্যদের রাজধানীতে উপস্থিতি চীনের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবেও বিবেচিত হয়েছিল।
এরপর উত্তেজনার কেন্দ্রে আসে দাগু বা তাকু দুর্গ। এই দুর্গগুলো তিয়ানজিন এবং বেইজিংয়ের দিকে সমুদ্রপথে প্রবেশের ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিদেশি নৌবাহিনী যখন দুর্গগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্যোগ নেয়, তখন চিং দরবারের ভেতরে এমন ধারণা শক্তিশালী হয় যে বিদেশি শক্তিগুলো শুধু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং বৃহত্তর সামরিক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই মুহূর্তে সিশির নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। রাজদরবারের রক্ষণশীল গোষ্ঠী তাকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে বিদেশিদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের সময় এসেছে এবং বক্সারদের শক্তিকে রাষ্ট্রের পক্ষে ব্যবহার করা উচিত। বক্সারদের কিছু দলকে কার্যত স্বীকৃতি ও সহযোগিতা দেওয়া শুরু হয়।
সিশি এবং তার সমর্থকেরা একটি মৌলিক ভুল মূল্যায়ন করেছিলেন। তারা বিদেশি শক্তিগুলোর সামরিক ক্ষমতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি এবং বক্সারদের সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করেছিলেন। বক্সারদের মধ্যে প্রচলিত আধ্যাত্মিক বিশ্বাস—বিশেষ আচার ও মার্শাল আর্টের মাধ্যমে গুলির বিরুদ্ধে অলৌকিক সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব—দরবারের কিছু রক্ষণশীল কর্মকর্তাকেও প্রভাবিত করেছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।
আধুনিক রাইফেল, মেশিনগান, কামান ও সংগঠিত আন্তর্জাতিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্সারদের ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র এবং আধ্যাত্মিক আত্মবিশ্বাস বাস্তবে কার্যকর সামরিক বিকল্প ছিল না। কিন্তু উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে যুক্তির পরিবর্তে আশা, গুজব ও বিদেশিবিরোধী আবেগ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে থাকে।
১৯০০ সালের জুনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বক্সাররা বেইজিংয়ে প্রবেশ করে। খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি সম্পত্তিতে আক্রমণ ঘটে। জার্মান রাষ্ট্রদূত ক্লেমেন্স ফন কেটেলার নিহত হন। বিদেশি কূটনীতিক, সৈন্য, বেসামরিক নাগরিক এবং বহু চীনা খ্রিস্টান লেগেশন কোয়ার্টারে আশ্রয় নেন।
এই সময় চিং সৈন্যদের আচরণও একরকম ছিল না। কিছু ইউনিট বিদেশিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং অবরোধে অংশ নেয়, আবার কিছু কর্মকর্তা সংঘর্ষ এড়াতে বা বিদেশিদের গোপনে সাহায্য করার চেষ্টা করেন। চিং সরকার তখন আর এককভাবে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো কাজ করছিল না; এর বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন নীতি অনুসরণ করছিল।
১৯০০ সালের ২১ জুন চিং দরবার বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। এটি ছিল সিশির শাসনামলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কাগজে এটি চীনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধ হলেও বাস্তবে চীন একই সঙ্গে বিশ্বের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
এমনকি চীনের সব প্রাদেশিক নেতা এই নির্দেশও মেনে নেননি। দক্ষিণ ও পূর্ব চীনের শক্তিশালী কিছু গভর্নর বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে সমঝোতা করে নিজেদের অঞ্চলকে যুদ্ধের বাইরে রাখার চেষ্টা করেন। এই ব্যবস্থা পরবর্তীকালে বিশেষ গুরুত্ব পায়, কারণ এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে চিং কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশ দেশের সর্বত্র কার্যকর ছিল না।
সিশির আশা ছিল, বিপুল জনসংখ্যা, চিং সেনাবাহিনী এবং বক্সারদের সমন্বিত প্রতিরোধ বিদেশি শক্তিগুলোকে পিছিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটি। আট-জাতি জোট সংগঠিত হয় এবং ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সৈন্যরা সামরিক অভিযান চালায়।
তিয়ানজিনের দিক থেকে অগ্রসর হওয়া বিদেশি বাহিনী চীনা প্রতিরোধ ভেঙে ১৯০০ সালের আগস্টে বেইজিংয়ে পৌঁছে যায়। অবরুদ্ধ লেগেশন কোয়ার্টার মুক্ত হয় এবং চিং সরকারের সামরিক কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে পড়ে।
বিদেশি বাহিনী রাজধানীর দিকে এগিয়ে আসার পর সিশি, গুয়াংশু সম্রাট এবং রাজদরবার বেইজিং ছেড়ে পশ্চিম দিকে পালিয়ে যান। সিশি সাধারণ পোশাকে রাজধানী ত্যাগ করেছিলেন বলে বহুল আলোচিত বিবরণ রয়েছে। যে শাসক কয়েক সপ্তাহ আগে বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাকে এখন নিজের রাজধানী ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যেতে হচ্ছিল।
এটি চিং সাম্রাজ্যের মর্যাদার জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক বিপর্যয় ছিল।
পরাজয়ের পর সিশির নীতিতে আবার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। এবার তিনি বক্সারদের থেকে নিজেকে দূরে সরাতে শুরু করেন এবং বিদেশিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথ বেছে নেন। যেসব কর্মকর্তাকে আগে বিদেশিবিরোধী অবস্থানের কারণে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল, তাদের অনেককেই পরে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।
এখানেই সিশির রাজনীতির বাস্তববাদী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কোনো স্থির আদর্শে আবদ্ধ হয়ে বক্সারদের সমর্থন করেননি। বরং যখন মনে হয়েছিল বক্সারদের মাধ্যমে বিদেশি শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব, তখন তাদের ব্যবহার করেছিলেন; আবার পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর নিজের রাজবংশ রক্ষার জন্য তাদের ত্যাগ করতেও পিছপা হননি।
১৯০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত বক্সার প্রোটোকলের মাধ্যমে চীনকে বিশাল ক্ষতিপূরণ, বিদেশি সেনা মোতায়েন, প্রতিরক্ষা দুর্গ ধ্বংস এবং বিভিন্ন কর্মকর্তাকে শাস্তিসহ কঠোর শর্ত মেনে নিতে হয়। ফলে যে নীতির মাধ্যমে সিশি বিদেশি প্রভাব কমাতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই নীতিই বিদেশি হস্তক্ষেপকে আরও গভীর করার পথ তৈরি করে।
তবে সিশির সিদ্ধান্তকে শুধু ব্যক্তিগত অজ্ঞতা বা কুসংস্কার দিয়ে ব্যাখ্যা করাও অসম্পূর্ণ। তার সামনে বাস্তব রাজনৈতিক সংকট ছিল। চীন বহু দশক ধরে সামরিকভাবে অপমানিত হচ্ছিল, বিদেশি শক্তিগুলো ক্রমাগত নতুন সুবিধা আদায় করছিল এবং চিং সরকারের অভ্যন্তরীণ বৈধতা দুর্বল হয়ে পড়ছিল। কোনো পদক্ষেপ না নিলে রাজদরবারকে বিদেশিদের কাছে দুর্বল মনে হওয়ার ঝুঁকি ছিল, আবার সরাসরি সংঘর্ষের সামরিক ক্ষমতাও চীনের ছিল না।
সিশি এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বক্সারদের এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তার প্রধান ভুল ছিল এই শক্তির প্রকৃতি ও সক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারা।
বক্সার সংকটের পর সিশি নিজেও উপলব্ধি করেন যে চীনের পুরোনো ব্যবস্থা আর টেকসই নয়। পরবর্তী বছরগুলোতে চিং সরকার সেনাবাহিনী, শিক্ষা ও প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এমনকি যে ধরনের সংস্কার ১৮৯৮ সালে আটকে দেওয়া হয়েছিল, তার অনেক ধারণাই পরে নতুন নীতির অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হতে থাকে।
এই বৈপরীত্য সিশির রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। যে শাসক দ্রুত সংস্কারকে একসময় নিজের ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করেছিলেন, বক্সার বিপর্যয়ের পর তিনিই বুঝতে বাধ্য হন যে সংস্কার ছাড়া রাজবংশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তবু সময় তখন চিং রাজবংশের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। বক্সার সংকট ও পরবর্তী প্রোটোকল চীনা জনগণের চোখে সরকারের অক্ষমতা আরও স্পষ্ট করে দেয়। বিদেশিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে ব্যর্থতা, রাজধানী হারানো এবং পরে অপমানজনক চুক্তি স্বাক্ষর—সব মিলিয়ে রাজবংশের মর্যাদা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সিশির বক্সার নীতির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক পরিহাস এখানেই। তিনি বক্সারদের ব্যবহার করে বিদেশি শক্তিকে দুর্বল করতে চেয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে চিং রাজবংশের ক্ষমতা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফল হয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বিদেশি শক্তিগুলো আরও বড় সামরিক বাহিনী নিয়ে চীনে প্রবেশ করে, রাজধানী দখল করে এবং চিং সরকারের ওপর আরও কঠোর শর্ত আরোপ করে।
তাই সম্রাজ্ঞী সিশির বক্সার বিদ্রোহে ভূমিকা ছিল নিছক বিদ্রোহীদের সমর্থনের গল্প নয়; এটি ছিল ভয়, জাতীয় অপমান, দরবারি রাজনীতি, বিদেশি চাপ এবং ভুল সামরিক হিসাবের এক জটিল সমন্বয়। বক্সারদের পাশে দাঁড়ানো ছিল চিং রাজবংশের মরিয়া রাজনৈতিক জুয়া। সেই জুয়ায় সিশি শুধু হেরে যাননি—তার পরিণতি চিং সাম্রাজ্যের বৈধতাকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং মাত্র এক দশকের মধ্যে রাজবংশটির পতনের পথ আরও প্রশস্ত করে।
কানপুরের বিদ্রোহ ও নানা সাহেব: অবরোধ, সংঘর্ষ ও ১৮৫৭ সালের রক্তাক্ত অধ্যায়
বাহাদুর শাহ জাফর ও দিল্লির বিদ্রোহ: শেষ মুঘল সম্রাট কীভাবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রতীকে পরিণত হন
মিরাট থেকে দিল্লি: ১০ মে ১৮৫৭ কীভাবে সিপাহী বিদ্রোহকে গণবিদ্রোহে পরিণত করেছিল
এডেসার পতন ও দ্বিতীয় ক্রুসেড (১১৪৭–১১৪৯): ইউরোপের বিশাল অভিযান কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটালার: ক্রুসেডের কিংবদন্তি যোদ্ধা ধর্মীয় সংগঠনগুলোর উত্থান
ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর উত্থান: জেরুজালেম, এডেসা, অ্যান্টিওক ও ত্রিপোলির ইতিহাস