বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বক্সার প্রোটোকলের পটভূমি: আফিম যুদ্ধ থেকে বিদেশি আধিপত্যে চীনের অপমানের ইতিহাস

Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 14, 2026
বক্সার প্রোটোকলের পটভূমি: আফিম যুদ্ধ থেকে বিদেশি আধিপত্যে চীনের অপমানের ইতিহাস
বক্সার প্রোটোকলের পটভূমি

১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল হঠাৎ করে সৃষ্টি হওয়া কোনো কূটনৈতিক চুক্তি ছিল না। এর পেছনে ছিল প্রায় ছয় দশক ধরে চলা সামরিক পরাজয়, অসম চুক্তি, বিদেশি বাণিজ্যিক অনুপ্রবেশ, ভূখণ্ডগত ছাড়, খ্রিস্টান মিশনারিদের বিস্তার এবং চিং সাম্রাজ্যের ক্রমাগত রাজনৈতিক দুর্বলতার ইতিহাস। বক্সার বিদ্রোহ ছিল সেই দীর্ঘ ক্ষোভের বিস্ফোরণ, আর বক্সার প্রোটোকল ছিল সেই বিস্ফোরণ দমনের পর চীনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কঠোর পরিণতি। তাই ১৯০১ সালের ঘটনাকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৮৪০-এর দশকের আফিম যুদ্ধের সময়ে।

অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত চীন নিজেকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সভ্যতা ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখত। চিং সাম্রাজ্যের বিশাল বাজার ইউরোপীয় বণিকদের আকৃষ্ট করলেও বিদেশি বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল। ইউরোপীয়দের চীনা চা, রেশম ও চীনামাটির পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল, কিন্তু চীনে ইউরোপীয় পণ্যের সমপরিমাণ বাজার তৈরি হয়নি। ফলে ব্রিটেনকে বিপুল পরিমাণ রৌপ্য দিয়ে চীনা পণ্য কিনতে হচ্ছিল। এই বাণিজ্যিক ভারসাম্য পরিবর্তনের জন্য ব্রিটিশ বণিকেরা ভারতে উৎপাদিত আফিম চীনে ব্যাপকভাবে বিক্রি করতে শুরু করে।

আফিমের বিস্তার চীনের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বিপুল পরিমাণ রৌপ্য দেশ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে এবং নেশাগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। চিং সরকার যখন আফিম বাণিজ্য কঠোরভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করে, তখন ব্রিটেনের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৮৩৯ সালে কমিশনার লিন জেশু গুয়াংজুতে বিপুল পরিমাণ আফিম বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত প্রথম আফিম যুদ্ধে রূপ নেয়।

১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌ ও সামরিক প্রযুক্তির সামনে চিং বাহিনীর দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে যায়। আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, উন্নত কামান এবং সংগঠিত নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে চীনের প্রতিরক্ষা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। পরাজিত চিং সরকার ১৮৪২ সালে নানকিং চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।

এই চুক্তি চীনের আধুনিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ব্রিটিশ বাণিজ্যের জন্য পাঁচটি বন্দর খুলে দেওয়া হয়, হংকং ব্রিটেনের হাতে চলে যায় এবং চীনকে বিপুল ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। পরবর্তী সম্পূরক চুক্তিগুলো বিদেশিদের আরও সুবিধা দেয়। অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিও দ্রুত একই ধরনের অধিকার আদায় করতে শুরু করে। এভাবেই চীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে এমন একটি চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা, যাকে পরবর্তী ইতিহাসে “অসম চুক্তি” নামে চিহ্নিত করা হয়।

এখানে “অসম” শব্দটির গুরুত্ব ছিল গভীর। চুক্তিগুলো সাধারণত সমান ক্ষমতাসম্পন্ন দুই রাষ্ট্রের স্বাধীন আলোচনার ফল ছিল না; সামরিক পরাজয়ের পর চীনকে শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। বিদেশিরা বন্দর ব্যবহারের বিশেষ অধিকার, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং ধীরে ধীরে এমন আইনি সুরক্ষা লাভ করে, যার ফলে চীনের নিজস্ব বিচারিক সার্বভৌমত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বহির্দেশীয় বিচারাধিকারের ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক বিদেশি নাগরিক চীনে অপরাধ বা বিরোধে জড়ালেও সাধারণ চীনা আদালতের পরিবর্তে নিজ দেশের কনস্যুলার আইনি ব্যবস্থার অধীনে বিচার পাওয়ার সুবিধা লাভ করে। একজন সাধারণ চীনা নাগরিকের চোখে এর অর্থ ছিল অত্যন্ত অপমানজনক—নিজের দেশের মাটিতে বিদেশির ওপর নিজের দেশের আইন সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

১৮৫৬ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে। এবার ব্রিটেনের সঙ্গে ফ্রান্সও সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেয়। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বিদেশি বাহিনী বেইজিং পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ১৮৬০ সালে ইউরোপীয় বাহিনী সম্রাটের বিখ্যাত পুরোনো গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ ইউয়ানমিংইউয়ান লুট ও ধ্বংস করে। ঘটনাটি চীনা ঐতিহাসিক স্মৃতিতে বিদেশি আগ্রাসনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।

যুদ্ধের পর বিদেশি শক্তিগুলোর অধিকার আরও বিস্তৃত হয়। নতুন বন্দর খুলে দেওয়া হয়, বিদেশি কূটনীতিকদের বেইজিংয়ে অবস্থানের সুযোগ নিশ্চিত হয় এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। ফলে বিদেশি উপস্থিতি শুধু উপকূলীয় বাণিজ্যকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না থেকে ধীরে ধীরে চীনের অভ্যন্তরেও পৌঁছাতে থাকে।

একই সময়ে চিং সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে বিপর্যস্ত ছিল। তাইপিং বিদ্রোহ ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। এর পাশাপাশি নিয়ান বিদ্রোহ এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন বিদ্রোহ সাম্রাজ্যের সামরিক ও আর্থিক শক্তি ক্ষয় করে। কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে আঞ্চলিক সেনাবাহিনী ও প্রাদেশিক নেতাদের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে।

চীনের কিছু কর্মকর্তা উপলব্ধি করেছিলেন যে পশ্চিমা সামরিক ও শিল্প প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এই উপলব্ধি থেকে স্বশক্তিকরণ আন্দোলন শুরু হয়। আধুনিক অস্ত্রাগার, জাহাজ নির্মাণকেন্দ্র, কারখানা, টেলিগ্রাফ ও নতুন ধরনের সামরিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এসব সংস্কার ছিল অসম্পূর্ণ। প্রযুক্তি গ্রহণ করা হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর গভীর সংস্কার সীমিত থেকে যায়।

চীনের দুর্বলতার আরেকটি নাটকীয় প্রমাণ আসে ১৮৯৪–১৮৯৫ সালের প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধে। কয়েক দশক আগেও চীনা রাজনৈতিক চিন্তায় জাপানকে তুলনামূলকভাবে ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু মেইজি পুনর্গঠনের পর জাপান দ্রুত আধুনিক সামরিক ও শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কোরিয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সংঘাত শুরু হলে আধুনিক জাপানি সেনা ও নৌবাহিনী চিং বাহিনীকে বিধ্বস্ত করে।

১৮৯৫ সালের শিমোনোসেকি চুক্তি চীনের জন্য আরেকটি বড় অপমান হয়ে আসে। চীন কোরিয়ার ওপর ঐতিহ্যগত প্রভাব হারায়, তাইওয়ান ও পেংহু দ্বীপপুঞ্জ জাপানের হাতে ছেড়ে দেয় এবং বিপুল ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়। যুদ্ধটি শুধু আরেকটি সামরিক পরাজয় ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে চীনের সংস্কার প্রচেষ্টা প্রতিবেশী জাপানের আধুনিকায়নের তুলনায় কতটা পিছিয়ে ছিল।

এরপর বিদেশি শক্তিগুলোর মধ্যে চীনকে ঘিরে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়। উনিশ শতকের শেষভাগে বিভিন্ন শক্তি বন্দর, রেলপথ, খনি এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অধিকার আদায় করতে থাকে। জার্মানি শানতুং অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে, রাশিয়া উত্তর-পূর্ব চীনে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে, ব্রিটেন বিভিন্ন কৌশলগত অঞ্চল ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত করে এবং ফ্রান্স দক্ষিণ চীনে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করে।

এই প্রক্রিয়াকে অনেক সময় “চীনের জন্য দৌড়” হিসেবে বর্ণনা করা হয়। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ উপনিবেশে পরিণত হয়নি, কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি শক্তির স্বার্থবলয় তৈরি হতে থাকে। রেলপথ নির্মাণের অধিকার থেকে খনি ব্যবহারের অনুমতি—অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিদেশি পুঁজি ও রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

বিদেশি প্রভাবের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকগুলোর একটি ছিল খ্রিস্টান মিশনারিদের বিস্তার। মিশনারিরা বিদ্যালয়, চিকিৎসাকেন্দ্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেও অনেক অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি সামাজিক সংঘাত সৃষ্টি করে। ধর্মান্তরিত চীনারা কখনও বিদেশি মিশনারি ও কনস্যুলার সুরক্ষার সুবিধা পাচ্ছেন—এমন ধারণা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। জমি, কর, গ্রামীণ বিরোধ ও স্থানীয় ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়।

এই অসন্তোষ বিশেষভাবে তীব্র হয়ে ওঠে উত্তর চীনের শানতুং অঞ্চলে। সেখানে বিদেশি মিশনারি কার্যক্রম, জার্মান প্রভাব, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় একসঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একাংশ মনে করতে শুরু করে যে বিদেশিদের উপস্থিতিই তাদের দুর্দশার অন্যতম কারণ।

এই পরিবেশ থেকেই শক্তিশালী হতে থাকে ইহেচুয়ান আন্দোলন, যাদের পশ্চিমারা “বক্সার” নামে ডাকত। তাদের মধ্যে মার্শাল আর্ট, ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক আচার এবং তীব্র বিদেশিবিরোধী মনোভাবের এক জটিল সমন্বয় ছিল। তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে বিদেশি মিশনারি, বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং চীনা খ্রিস্টান সম্প্রদায়।

১৮৯৮ সালের সংস্কার প্রচেষ্টার ব্যর্থতাও সংকটকে গভীর করে। গুয়াংশু সম্রাটের সমর্থনে পরিচালিত শত দিবসের সংস্কার প্রশাসন, শিক্ষা ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রক্ষণশীল শক্তির প্রতিরোধ এবং সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশির হস্তক্ষেপে সেই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই থেমে যায়। ফলে চীন আধুনিকায়নের জরুরি প্রয়োজন বুঝতে পারলেও কার্যকর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।

১৮৯৯ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে বক্সার আন্দোলন দ্রুত বিস্তার লাভ করলে চিং দরবার এক কঠিন দ্বিধার মুখে পড়ে। আন্দোলনটি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু দরবারের একটি অংশ বিশ্বাস করেছিল এই বিদেশিবিরোধী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা আধিপত্য দুর্বল করা সম্ভব। দশকের পর দশক বিদেশি শক্তির কাছে অপমানিত একটি সাম্রাজ্যের জন্য বক্সারদের আবির্ভাব একই সঙ্গে বিপজ্জনক এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।

১৯০০ সালে সংকট বেইজিংয়ে পৌঁছে যায়। বিদেশি দূতাবাস এলাকা অবরুদ্ধ হয়, মিশনারি ও চীনা খ্রিস্টানদের ওপর ব্যাপক আক্রমণ ঘটে এবং বিদেশি কূটনীতিক ও নাগরিকদের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হয়। চিং সরকারের অবস্থান শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের দিকে চলে যায়।

এরপর আট-জাতি জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির বাহিনী চীনে অভিযান চালায়। ১৯০০ সালের আগস্টে তারা বেইজিংয়ে প্রবেশ করে। চিং রাজদরবার রাজধানী ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। বহু দশকের সামরিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার যে ধারাবাহিকতা প্রথম আফিম যুদ্ধে স্পষ্ট হয়েছিল, তা এবার সাম্রাজ্যের রাজধানী বিদেশি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার মধ্য দিয়ে চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।

পরাজয়ের পর চিং সরকারের হাতে আলোচনার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। বিদেশি শক্তিগুলো ক্ষতিপূরণ, সামরিক নিরাপত্তা, অপরাধীদের শাস্তি এবং নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য কঠোর শর্ত দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বক্সার প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়।

এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, বক্সার প্রোটোকলকে শুধু ১৯০০ সালের বিদ্রোহের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা অসম্পূর্ণ। ১৮৪২ সালের নানকিং চুক্তি থেকে ১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকল পর্যন্ত প্রায় ছয় দশক ছিল চীনের সার্বভৌম ক্ষমতা ক্রমাগত সংকুচিত হওয়ার যুগ। প্রথমে বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল, তারপর বিদেশিরা বিশেষ আইনি ও বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়েছিল, এরপর ভূখণ্ড ও প্রভাববলয় হারিয়েছিল চীন, এবং শেষ পর্যন্ত রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বিদেশি সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই ধারাবাহিক অপমান চীনা জাতীয়তাবাদের বিকাশেও গভীর ভূমিকা রাখে। সাধারণ মানুষের কাছে বিদেশি শক্তি শুধু দূরের কোনো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ছিল না; রেলপথ, মিশনারি, বন্দর, কনস্যুলার আদালত, বিদেশি সৈন্য এবং অর্থনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে চিং সরকারকে ক্রমেই এমন একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, যা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে ব্যর্থ।

ফলে বক্সার প্রোটোকলের পটভূমি আসলে একটি চুক্তির ইতিহাসের চেয়েও বড়। এটি ছিল পুরোনো সাম্রাজ্যিক চীন এবং শিল্পায়িত সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের সংঘর্ষের ইতিহাস। প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অসম আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ব্যর্থ সংস্কার একসঙ্গে চীনকে এমন অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল যেখানে বিদেশি শক্তিগুলো তার অভ্যন্তরীণ বিষয়েও শর্ত আরোপ করতে সক্ষম হয়।

আফিম যুদ্ধ সেই সংকটের দরজা খুলেছিল, আর বক্সার প্রোটোকল দেখিয়ে দিয়েছিল চীন কত দূর পিছিয়ে পড়েছে। ১৯০১ সালের অপমান তাই শুধু অতীতের পরাজয়ের সমাপ্তি ছিল না। এটি চীনা সমাজে আরও গভীর একটি উপলব্ধি তৈরি করেছিল—রাষ্ট্রকে আমূল পরিবর্তন না করলে বিদেশি আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধিই পরবর্তী সংস্কার, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত চিং সাম্রাজ্যের পতনের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।