বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পূর্ব ইউরোপে ভাইকিংদের অভিযান: ভারাঙ্গিয়ান, রুস, কিয়েভ ও কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত নর্স সম্প্রসারণ

সিরিজ: ভাইকিং যুগ: অভিযান, বিজয় ও নর্স সভ্যতার ইতিহাস

পূর্ব ইউরোপে ভাইকিংদের অভিযান: ভারাঙ্গিয়ান, রুস, কিয়েভ ও কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত নর্স সম্প্রসারণ
বাল্টিক থেকে কনস্টান্টিনোপল—নর্সদের পূর্বমুখী যাত্রা

ভাইকিং যুগের ইতিহাসে ব্রিটেনের মঠে হামলা, ইংল্যান্ডের ডেনল কিংবা ফ্রান্সের নরম্যান্ডি এত বেশি আলোচিত যে নর্স সম্প্রসারণের আরেকটি বিশাল ক্ষেত্র অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। অথচ বাল্টিক সাগর থেকে পূর্ব ইউরোপের নদীপথ ধরে কৃষ্ণসাগর, কিয়েভ এবং শেষ পর্যন্ত কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত নর্সদের বিস্তার ভাইকিং যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পশ্চিমে যেখানে নর্সরা প্রধানত সমুদ্রপথে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রাঙ্কিশ ভূখণ্ডে পৌঁছেছিল, পূর্বদিকে তারা নদীগুলোকে ব্যবহার করেছিল মহাদেশের গভীরে প্রবেশের পথ হিসেবে।

পূর্বদিকে যাত্রাকারী স্ক্যান্ডিনেভীয়দের সঙ্গে বিশেষভাবে বর্তমান সুইডেনের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সম্পর্ক ছিল। বাল্টিক সাগর পেরিয়ে তারা ফিনল্যান্ড উপসাগর এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন নদীপথে প্রবেশ করত। পশ্চিম ইউরোপীয় উৎসে যাদের সাধারণভাবে ভাইকিং বলা হয়, বাইজেন্টাইন ও পূর্ব ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে তাদের একটি অংশ ভারাঙ্গিয়ান নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে “ভাইকিং”, “ভারাঙ্গিয়ান” ও “রুস”—এই শব্দগুলো সব সময় একই জনগোষ্ঠীর জন্য একই অর্থে ব্যবহৃত হয়নি।

এই পূর্বমুখী সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বাণিজ্য। উত্তর ইউরোপের পশম, মোম, মধু, অ্যাম্বার এবং অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের দক্ষিণে চাহিদা ছিল। অন্যদিকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং ইসলামি বিশ্বের রৌপ্য, মুদ্রা, রেশম, মসলা, মদ ও বিলাসপণ্য উত্তরের বাজারে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। মানুষকেও দাস হিসেবে বন্দী ও বিক্রি করা হতো, যা এই বাণিজ্যব্যবস্থার একটি নিষ্ঠুর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় পাওয়া বিপুলসংখ্যক আরবি রৌপ্য দিরহাম পূর্বমুখী বাণিজ্যের ব্যাপ্তির শক্তিশালী প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। বিশেষ করে বর্তমান সুইডেনের গটল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামি বিশ্বের হাজার হাজার মুদ্রা পাওয়া গেছে। এগুলো দেখায় যে ভাইকিং যুগের স্ক্যান্ডিনেভিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন উত্তরাঞ্চল ছিল না; বরং দূরবর্তী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত অর্থনৈতিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।

পূর্ব ইউরোপের ভূগোল নর্সদের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। অসংখ্য নদী উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হলেও সব নদী সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে নাবিকদের কখনো একটি নদী থেকে জাহাজ তুলে স্থলপথে টেনে বা বহন করে অন্য নদীতে নামাতে হতো। এই প্রক্রিয়াকে portage বলা হয়। নর্সদের তুলনামূলক হালকা ও অগভীর তলদেশের জাহাজ এই ধরনের পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী ছিল।

পূর্বমুখী নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল লাডোগা হ্রদের দক্ষিণে স্টারায়া লাডোগা, যার ইতিহাস অষ্টম শতক পর্যন্ত পৌঁছায়। পরে নভগোরদ অঞ্চলেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র বিকশিত হয়। এখানে নর্সরা কোনো জনশূন্য ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি। পূর্ব ইউরোপে আগে থেকেই বিভিন্ন স্লাভিক, ফিনিক ও বাল্টিক জনগোষ্ঠী বসবাস করত এবং তাদের নিজস্ব সমাজ, বাণিজ্য ও ক্ষমতার কাঠামো ছিল।

এই স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও স্ক্যান্ডিনেভীয়দের সম্পর্ক শুধু যুদ্ধের ছিল না। কোথাও সংঘর্ষ হয়েছে, কোথাও কর বা শ্রদ্ধা আদায় করা হয়েছে, আবার কোথাও বাণিজ্য, বিবাহ এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। পূর্ব ইউরোপে নর্স উপস্থিতির প্রকৃত ইতিহাস তাই বহিরাগত ভাইকিংদের একতরফা বিজয়ের গল্প নয়; বরং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিথস্ক্রিয়ায় নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার ইতিহাস।

এই প্রেক্ষাপটেই ইতিহাসে আসে “রুস” নামটি। শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। বহুল গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যায় এর প্রাথমিক সম্পর্ক স্ক্যান্ডিনেভীয়, বিশেষ করে সুইডিশ নর্স গোষ্ঠীর সঙ্গে ছিল। তবে রুস রাজনৈতিক সমাজ দ্রুত স্থানীয় স্লাভিক ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পরবর্তী কিয়েভান রুসকে সরলভাবে “একটি ভাইকিং রাষ্ট্র” বলা যথেষ্ট নয়।

রুসের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসচর্চায় বিখ্যাত বিতর্কটি সাধারণভাবে নরম্যানিস্ট ও অ্যান্টি-নরম্যানিস্ট বিতর্ক নামে পরিচিত। মধ্যযুগীয় Primary Chronicle বা Tale of Bygone Years-এ বর্ণিত হয়েছে যে বিভিন্ন স্থানীয় গোষ্ঠী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ভারাঙ্গিয়ানদের আহ্বান করেছিল এবং রুরিক নামে এক নেতা ৮৬২ সালের কাছাকাছি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। কিন্তু এই বিবরণ ঘটনাগুলোর বহু পরে রচিত, তাই এর প্রতিটি অংশকে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

রুরিকের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও তাঁর ভূমিকার বিস্তারিত নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও নবম শতকে পূর্ব ইউরোপের উত্তরাঞ্চলে স্ক্যান্ডিনেভীয় উপস্থিতির শক্তিশালী প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত একটি মিশ্র রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছিল। নর্স সামরিক ও বাণিজ্যিক অভিজাতদের সঙ্গে স্থানীয় স্লাভিক জনগোষ্ঠীর সংযোগই পরবর্তী রুস শক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে কিয়েভPrimary Chronicle-এর ঐতিহ্য অনুযায়ী রুরিকের উত্তরসূরি ওলেগ ৮৮২ সালের দিকে কিয়েভ দখল করেন এবং উত্তর ও দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথকে একই রাজনৈতিক শক্তির অধীনে আনেন। তারিখ ও ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কিয়েভের ভৌগোলিক গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহ নেই। দনিপ্র নদীর তীরে অবস্থানের কারণে এটি উত্তরের বাল্টিক অঞ্চল এবং দক্ষিণের কৃষ্ণসাগরীয় বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারত।

এই পথটি পরবর্তী সময়ে “ভারাঙ্গিয়ানদের থেকে গ্রিকদের পথ” নামে পরিচিত হয়। বাল্টিক অঞ্চল থেকে নেভা নদী, লাডোগা হ্রদ, বিভিন্ন নদী ও স্থলপথ অতিক্রম করে দনিপ্র ব্যবস্থায় পৌঁছে দক্ষিণে কৃষ্ণসাগর এবং সেখান থেকে বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে যাওয়া সম্ভব ছিল। বাস্তবে পথটি ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং একাধিক নদী, জলবিভাজিকা ও portage অতিক্রম করতে হতো।

বিশেষ করে দনিপ্র নদীর প্রপাত ও বিপজ্জনক অংশগুলো ছিল বড় বাধা। বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্টান্টিন সপ্তমের দশম শতকের বিবরণ থেকে জানা যায়, রুস বণিকদের কিছু স্থানে নৌকা নামিয়ে মালপত্র বহন করতে এবং জাহাজ স্থলপথে নিয়ে যেতে হতো। একই সঙ্গে আক্রমণকারী যাযাবর গোষ্ঠীর ঝুঁকিও ছিল। ফলে কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত যাত্রা ছিল শুধু নৌদক্ষতার পরীক্ষা নয়; এটি ছিল দীর্ঘ ও বিপজ্জনক বাণিজ্যিক অভিযান।

নর্স-রুসদের কাছে কনস্টান্টিনোপল ছিল বিস্ময়কর সম্পদের শহর। তারা শহরটিকে নর্স ঐতিহ্যে মিকলাগার্ড, অর্থাৎ “মহান নগরী” নামে চিনত। সে সময় বাইজেন্টাইন রাজধানী ছিল ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ, সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী নগর। এর বাজারে রেশম, মদ, অলংকার, মুদ্রা এবং দূরবর্তী অঞ্চলের বিলাসপণ্য পাওয়া যেত।

সম্পর্ক অবশ্য সব সময় শান্তিপূর্ণ ছিল না। ৮৬০ সালে রুস বাহিনী কনস্টান্টিনোপলের আশপাশে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। পরবর্তী দশকগুলোতেও রুস ও বাইজেন্টাইনদের মধ্যে যুদ্ধ ও আলোচনা উভয়ই ঘটে। Primary Chronicle ও বাইজেন্টাইন উৎসে ওলেগের ৯০৭ সালের অভিযানের কথা পাওয়া গেলেও এর বিস্তারিত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে ৯১১ সালের রুস-বাইজেন্টাইন চুক্তি বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

দশম শতকে সম্পর্ক আরও জটিল হয়। ইগর-এর শাসনামলে ৯৪১ সালে রুস বাহিনী বাইজেন্টাইন ভূখণ্ডে আক্রমণ করে, কিন্তু বাইজেন্টাইনদের বিখ্যাত গ্রিক ফায়ার নৌবহরের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী অভিযানের পর ৯৪৪/৯৪৫ সালের দিকে নতুন চুক্তি গড়ে ওঠে। অর্থাৎ কনস্টান্টিনোপল ও রুসের সম্পর্ক কখনো যুদ্ধ, কখনো বাণিজ্য এবং কখনো কূটনৈতিক সমঝোতার মধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে।

কিয়েভান রুসের চরিত্রও ধীরে ধীরে স্ক্যান্ডিনেভীয় উৎস থেকে অনেক বিস্তৃত পূর্ব ইউরোপীয় রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ নেয়। শাসকগোষ্ঠীর নর্স নামের পাশাপাশি স্লাভিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব দ্রুত বাড়ে। স্বিয়াতোস্লাভ-এর সময়ে এই রূপান্তর বিশেষভাবে দৃশ্যমান। তাঁর নাম স্লাভিক হলেও তাঁর সামরিক সংস্কৃতিতে পুরোনো রুস যোদ্ধা ঐতিহ্যের প্রভাব ছিল।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ভ্লাদিমির দ্য গ্রেটের শাসনামলে। ৯৮৮ সালের কাছাকাছি তিনি বাইজেন্টাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং কিয়েভান রুসের খ্রিস্টীয়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে কিয়েভের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কনস্টান্টিনোপলের সঙ্গে আরও গভীর হয়। বাইজেন্টাইন ধর্ম, শিল্প, স্থাপত্য ও লিখিত সংস্কৃতি পূর্ব ইউরোপে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

একই সময়ে নর্স যোদ্ধাদের সঙ্গে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সম্পর্ক নতুন রূপ নেয়। ভারাঙ্গিয়ান গার্ড নামে পরিচিত অভিজাত সামরিক বাহিনীতে স্ক্যান্ডিনেভীয় এবং পরে অ্যাংলো-স্যাক্সন যোদ্ধারাও বাইজেন্টাইন সম্রাটের ব্যক্তিগত রক্ষী ও বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে দশম শতকের শেষভাগ থেকে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভারাঙ্গিয়ান গার্ডের খ্যাতির একটি কারণ ছিল সম্রাটের প্রতি তাদের ব্যক্তিগত আনুগত্য। বাইজেন্টাইন দরবারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম সম্পর্ক থাকায় বিদেশি যোদ্ধারা কখনো সম্রাটের কাছে নির্ভরযোগ্য রক্ষী হিসেবে বিবেচিত হতো। ফলে যে নর্স যোদ্ধাদের পূর্বসূরিরা একসময় কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করেছিল, তাদের উত্তরসূরিদেরই একটি অংশ পরে সেই শহরের সম্রাটকে রক্ষা করত।

পূর্ব ইউরোপে নর্স সম্প্রসারণের এই ইতিহাস পশ্চিমের ভাইকিং অভিযানের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখায়। ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সে মঠ ও নগরে হামলার দৃশ্য ভাইকিংদের পরিচয়ের কেন্দ্রে থাকলেও পূর্বদিকে বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ, কর আদায়, নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক একীকরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সহিংসতা অবশ্যই ছিল, কিন্তু শুধু সহিংসতা দিয়ে এই বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যাখ্যা করা যায় না।

এই যোগাযোগের ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ছিল অসাধারণ। সুইডেন ও গটল্যান্ডে আরবি মুদ্রা, পূর্ব ইউরোপে স্ক্যান্ডিনেভীয় ধরনের সমাধি ও সামগ্রী এবং বাইজেন্টাইন উৎসে রুস ও ভারাঙ্গিয়ানদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে একটি এমন জগতের ছবি পাওয়া যায় যেখানে স্ক্যান্ডিনেভিয়া, বাল্টিক, পূর্ব ইউরোপ, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং ইসলামি বিশ্বের অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তবে কিয়েভান রুসকে নর্সদের সরাসরি ও অপরিবর্তিত উপনিবেশ হিসেবে দেখা ভুল হবে। কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই শাসকগোষ্ঠী স্থানীয় স্লাভিক সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে একীভূত হয়। ভাষা, ধর্ম, বিবাহ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে একটি নতুন সমাজ গড়ে ওঠে। রুসের ইতিহাস তাই নর্স প্রভাবের ইতিহাস হলেও একই সঙ্গে স্লাভিক, ফিনিক, বাল্টিক, স্টেপ অঞ্চলের জনগোষ্ঠী ও বাইজেন্টাইন বিশ্বের পারস্পরিক সংযোগের ইতিহাস।

পশ্চিমে ভাইকিং লংশিপ লিন্ডিসফার্ন, প্যারিস ও ইংল্যান্ডের উপকূলে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। পূর্বে একই নৌপ্রযুক্তি নদীপথের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের দরজা খুলে দেয়। জাহাজ কখনো বাণিজ্যপণ্য বহন করেছে, কখনো সৈন্য, কখনো কর হিসেবে সংগৃহীত সম্পদ, আবার কখনো দূরদেশে ভাগ্য অন্বেষণকারী যোদ্ধা।

পূর্ব ইউরোপে ভাইকিং সম্প্রসারণ তাই ভাইকিং যুগের প্রকৃত আন্তর্জাতিক চরিত্র বোঝার অন্যতম চাবিকাঠি। বাল্টিকের উপকূল থেকে লাডোগা ও নভগোরদ, সেখান থেকে কিয়েভ ও দনিপ্র, তারপর কৃষ্ণসাগর পেরিয়ে কনস্টান্টিনোপল—এই দীর্ঘ পথ নর্সদের শুধু নতুন সম্পদের কাছে নিয়ে যায়নি। এটি এমন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সৃষ্টি করেছিল, যার মধ্য থেকে রুসের শক্তি বিকশিত হয় এবং পূর্ব ইউরোপের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।


আপনার পছন্দ হতে পারে