বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জাপানের ওকুনোশিমা কেন ‘খরগোশের দ্বীপ’ নামে পরিচিত? রহস্যময় ইতিহাস ও শত শত খরগোশের গল্প

জাপানের ওকুনোশিমা কেন ‘খরগোশের দ্বীপ’ নামে পরিচিত? রহস্যময় ইতিহাস ও শত শত খরগোশের গল্প
ওকুনোশিমা—অন্ধকার ইতিহাসের মাঝে খরগোশের দ্বীপ

জাপানের সেতো অন্তর্দেশীয় সাগরের শান্ত নীল জলের মাঝে ছোট্ট একটি দ্বীপ। সবুজ গাছপালা, নিরিবিলি পথ আর সমুদ্রের বাতাসে প্রথম দেখায় এটিকে জাপানের আর দশটি সুন্দর দ্বীপের মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু নৌকা থেকে নেমে কিছুটা এগোলেই অস্বাভাবিক একটি দৃশ্য চোখে পড়ে—পথের পাশে, ঘাসের মাঠে, ঝোপের নিচে কিংবা পুরোনো ভবনের আশপাশে অসংখ্য খরগোশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

দ্বীপটির নাম ওকুনোশিমা। তবে পৃথিবীর বহু মানুষের কাছে এটি এখন ‘খরগোশের দ্বীপ’ নামেই বেশি পরিচিত।

আজকের ওকুনোশিমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো খরগোশ। কিন্তু দ্বীপটির অতীত মোটেও এত কোমল ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও যুদ্ধের সময় এখানে গোপনে তৈরি হতো রাসায়নিক অস্ত্র। ফলে বর্তমানের শান্ত, খরগোশে ভরা দ্বীপটির নিচে লুকিয়ে আছে জাপানের সামরিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়।

ওকুনোশিমা কোথায়?

ওকুনোশিমা জাপানের হিরোশিমা অঞ্চলের তাকেহারা এলাকার অন্তর্গত একটি ছোট দ্বীপ। এটি সেতো অন্তর্দেশীয় সাগরে অবস্থিত। দ্বীপটির আয়তন খুব বেশি নয় এবং পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখাও তুলনামূলক সহজ।

মূল ভূখণ্ড থেকে নৌপথে এখানে পৌঁছানো যায়। বর্তমানে দ্বীপে পর্যটকদের জন্য হাঁটার পথ, থাকার ব্যবস্থা, জাদুঘর এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

তবে এসবের মাঝেও সবচেয়ে বেশি নজর কেড়ে নেয় খরগোশগুলো। মানুষের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হওয়ায় অনেক খরগোশ পর্যটকদের কাছে চলে আসে। খাবারের আশায় কখনো কখনো তারা মানুষের চারপাশে জড়ো হয়।

এই দৃশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভ্রমণবিষয়ক প্রচারের মাধ্যমে ওকুনোশিমাকে আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত করে তুলেছে।

এত খরগোশ দ্বীপে এল কীভাবে?

এটাই ওকুনোশিমাকে ঘিরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন।

দ্বীপের বর্তমান খরগোশগুলোর সঠিক উৎস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গল্প প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি হলো—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিষাক্ত গ্যাস পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত খরগোশগুলোর বংশধরই নাকি আজকের খরগোশগুলো।

গল্পটি আকর্ষণীয় হলেও ঐতিহাসিকভাবে বিষয়টি এত সরল নয়।

যুদ্ধকালীন রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচিতে পরীক্ষামূলক কাজে খরগোশ ব্যবহারের ইতিহাস থাকলেও বর্তমান দ্বীপের খরগোশগুলো সরাসরি সেই প্রাণীদের বংশধর—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। যুদ্ধ শেষে কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারের প্রাণীগুলো সরিয়ে ফেলা বা মেরে ফেলা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে জানা যায়।

বর্তমান খরগোশের জনসংখ্যার উৎপত্তি সম্পর্কে অধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া কয়েকটি গৃহপালিত বা পোষা খরগোশ থেকেই ধীরে ধীরে বড় একটি জনসংখ্যা তৈরি হয়।

প্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে কয়েকটি খরগোশ দ্বীপে ছাড়া হয়েছিল। অনুকূল পরিবেশ, তুলনামূলক কম শিকারি প্রাণী এবং মানুষের দেওয়া খাবার তাদের দ্রুত বংশবিস্তারে সহায়তা করে।

খরগোশের জন্য ওকুনোশিমা এত উপযোগী হলো কেন?

খরগোশ দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। উপযুক্ত পরিবেশে অল্পসংখ্যক খরগোশ থেকেও কয়েক বছরের মধ্যে বড় জনসংখ্যা তৈরি হতে পারে।

ওকুনোশিমায় তাদের জন্য কয়েকটি বিশেষ সুবিধা তৈরি হয়েছিল।

দ্বীপে বড় আকারের প্রাকৃতিক শিকারি প্রাণীর চাপ তুলনামূলকভাবে কম। বিস্তৃত ঝোপঝাড়, ঘাস এবং গাছপালা তাদের লুকিয়ে থাকা ও বিশ্রামের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহজে খাবার পাওয়ার সুযোগও বেড়েছে।

ফলে মানুষের উপস্থিতি এখানে খরগোশের জনসংখ্যাকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে।

তবে বাইরে থেকে দৃশ্যটি যতটা আনন্দময় মনে হয়, বাস্তবে অতিরিক্ত জনসংখ্যা খরগোশগুলোর জন্য সব সময় ভালো নয়। সীমিত প্রাকৃতিক খাদ্য, রোগের বিস্তার, অপুষ্টি এবং মানুষের দেওয়া অনুপযুক্ত খাবার তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

একসময় মানচিত্র থেকেও আড়াল করা হয়েছিল দ্বীপটিকে

ওকুনোশিমার বর্তমান পরিচয়ের সঙ্গে এর অতীতের পার্থক্য বিস্ময়কর।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে জাপান সামরিক শক্তি বাড়ানোর সময় রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির একটি গোপন কেন্দ্র হিসেবে দ্বীপটিকে বেছে নেয়। এর অবস্থান ছিল তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন, আবার সামরিক ও শিল্পকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগও সম্ভব ছিল।

১৯২৯ সালে এখানে বিষাক্ত গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়।

কারখানায় মূলত সামরিক ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান ও বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করা হতো। এর মধ্যে সরিষা গ্যাসের মতো মারাত্মক রাসায়নিক অস্ত্রও ছিল।

পুরো কার্যক্রম কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে পরিচালিত হতো। ওকুনোশিমাকে ঘিরে এমন গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল যে সেই সময়ের কিছু সরকারি মানচিত্রে দ্বীপটির উপস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে।

সাধারণ মানুষের কাছে দ্বীপে কী ঘটছে, তা জানার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

বিষাক্ত গ্যাস কারখানার শ্রমিকদের অজানা যন্ত্রণা

ওকুনোশিমার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ শুধু অস্ত্র উৎপাদন নয়, সেখানে কাজ করা মানুষদের অভিজ্ঞতাও।

কারখানার শ্রমিকেরা বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসতেন। তখনকার সুরক্ষাব্যবস্থা আধুনিক রাসায়নিক শিল্পের মানের তুলনায় দুর্বল ছিল। দীর্ঘ সময় বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে থাকার কারণে অনেক শ্রমিক ত্বক, চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছিলেন।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। মজুত রাসায়নিক পদার্থ ও উৎপাদনব্যবস্থা ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার কাজ শুরু হয়।

কিন্তু ইতিহাসকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।

আজও দ্বীপে পুরোনো সামরিক স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষ এবং রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদনের যুগের বিভিন্ন চিহ্ন দেখা যায়।

খরগোশ আর ধ্বংসাবশেষ—এক অদ্ভুত বৈপরীত্য

ওকুনোশিমার সবচেয়ে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই।

একটি পথ ধরে হাঁটলে সামনে দেখা যেতে পারে কয়েকটি ছোট খরগোশ ঘাস খাচ্ছে। আর সেই পথ থেকে অল্প দূরেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে যুদ্ধকালীন কোনো পরিত্যক্ত স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ।

একদিকে প্রাণবন্ত প্রকৃতি, অন্যদিকে যুদ্ধের স্মৃতি।

এই বৈপরীত্য ওকুনোশিমাকে সাধারণ পর্যটন দ্বীপ থেকে আলাদা করেছে। অনেক দর্শনার্থী প্রথমে খরগোশ দেখতেই এখানে আসেন, কিন্তু দ্বীপ ঘুরতে গিয়ে জাপানের রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির ইতিহাসের মুখোমুখি হন।

দ্বীপে থাকা বিষাক্ত গ্যাস জাদুঘর এই ইতিহাস সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখানে রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদন, শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

পর্যটকদের খাবারের ওপর নির্ভরতা কি খরগোশের জন্য বিপজ্জনক?

ওকুনোশিমার জনপ্রিয়তা খরগোশগুলোর জন্য আশীর্বাদ এবং সমস্যা—দুটিই তৈরি করেছে।

পর্যটকেরা খরগোশকে খাবার দেওয়ার কারণে অনেক প্রাণী মানুষের কাছাকাছি থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু মানুষের জন্য তৈরি বিস্কুট, রুটি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খরগোশের স্বাভাবিক খাদ্য নয়।

আরেকটি সমস্যা হলো পানির প্রাপ্যতা। দ্বীপে মিঠাপানির প্রাকৃতিক উৎস সীমিত। গরম সময়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া প্রাণীগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পর্যটনের মৌসুমভেদে মানুষের সংখ্যা কমে গেলে খাবারের সহজ সরবরাহও কমে যেতে পারে। অতিরিক্তভাবে মানুষের খাবারের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীদের জন্য এই পরিবর্তন সমস্যাজনক।

তাই খরগোশকে শুধু পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবে না দেখে একটি দ্বীপীয় বাস্তুতন্ত্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

খরগোশগুলো কি সত্যিই বন্য?

ওকুনোশিমার খরগোশকে প্রায়ই ‘বন্য খরগোশ’ বলা হলেও বিষয়টি কিছুটা জটিল।

এরা মানুষের ঘরে পোষা প্রাণী নয় এবং দ্বীপে স্বাধীনভাবে বসবাস করে। কিন্তু তাদের জনসংখ্যার শিকড় মূলত গৃহপালিত খরগোশের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়।

অর্থাৎ এরা এমন একটি মুক্তভাবে বসবাসকারী জনসংখ্যা, যাদের পূর্বপুরুষ মানুষের মাধ্যমে দ্বীপে পৌঁছেছিল।

এ কারণেই তাদের জীবনযাপন পুরোপুরি প্রাকৃতিক বন্য খরগোশের মতো নয়। মানুষের সঙ্গে তাদের অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতাও সেই ইতিহাসের ফল।

খরগোশের দ্বীপ এখন জাপানের জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ

ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওকুনোশিমার পরিচিতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের পেছনে ছুটে আসা খরগোশ, চারপাশে বসে থাকা ছোট ছোট প্রাণী কিংবা একসঙ্গে অসংখ্য খরগোশের ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ধীরে ধীরে ‘র‍্যাবিট আইল্যান্ড’ নামটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

কিন্তু শুধু খরগোশ দেখলে ওকুনোশিমার অর্ধেক গল্পই জানা হয়।

দ্বীপটির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে এর দুই বিপরীত পরিচয়কে পাশাপাশি দেখতে হয়—একদিকে যুদ্ধ, গোপন রাসায়নিক অস্ত্র ও মানবিক দুর্ভোগের ইতিহাস; অন্যদিকে শান্ত প্রকৃতি এবং মানুষের কাছে নির্ভয়ে এগিয়ে আসা খরগোশ।

অন্ধকার অতীত থেকে শান্তির দ্বীপ

ওকুনোশিমার গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এর পরিবর্তন।

যে দ্বীপে একসময় গোপনে প্রাণঘাতী রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি হতো, সেই দ্বীপই আজ মানুষের কাছে পরিচিত অসংখ্য খরগোশের শান্ত আবাস হিসেবে। যুদ্ধকালীন ভবনের ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে খরগোশ ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য তাই শুধু সুন্দর নয়—ঐতিহাসিকভাবেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে জনপ্রিয় গল্প আর প্রকৃত ইতিহাসকে আলাদা করে দেখা জরুরি। আজকের খরগোশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধকালীন পরীক্ষাগারের খরগোশের বংশধর বলা আকর্ষণীয় শোনালেও তার পক্ষে শক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বরং যুদ্ধের কয়েক দশক পরে দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া খরগোশ থেকেই বর্তমান জনসংখ্যা গড়ে ওঠার ব্যাখ্যাটি বেশি গ্রহণযোগ্য।

এই কারণেই ওকুনোশিমা কেবল ‘খরগোশের দ্বীপ’ নয়। এটি এমন এক জায়গা, যেখানে একই ভূখণ্ডে জাপানের যুদ্ধকালীন গোপন ইতিহাস, মানুষের দুর্ভোগ, প্রকৃতির পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক পর্যটনের গল্প একসঙ্গে মিশে আছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে