প্যাটাগোনিয়া: দক্ষিণ আমেরিকার বন্য ভূখণ্ড এত অসাধারণ কেন?
আন্দিজের বরফ, শুষ্ক তৃণভূমি ও সমুদ্রের মিলনে প্যাটাগোনিয়ার অসাধারণ ভূদৃশ্য।
একদিকে আকাশের দিকে উঠে থাকা ধারালো পাহাড়, অন্যদিকে দিগন্তজোড়া শুষ্ক তৃণভূমি। কোথাও ঘন বৃষ্টিভেজা বন, কোথাও নীল বরফের দেয়াল ভেঙে পড়ছে হ্রদের পানিতে। আরও পূর্বে আটলান্টিকের উপকূলে তিমি, পেঙ্গুইন ও সামুদ্রিক সিংহের জীবন। এই বিপরীত ভূদৃশ্যগুলো একই বিস্তৃত অঞ্চলের অংশ—প্যাটাগোনিয়া। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণভাগে অবস্থিত এই ভূখণ্ডের অসাধারণত্ব শুধু দূরত্ব বা নির্জনতায় নয়; পাহাড়, বাতাস, বরফ ও সমুদ্রের পারস্পরিক প্রভাবে তৈরি বৈচিত্র্যে।
প্যাটাগোনিয়া কোনো স্বাধীন দেশ বা একক প্রশাসনিক অঞ্চল নয়। এটি আর্জেন্টিনা ও চিলিজুড়ে বিস্তৃত একটি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অঞ্চল। এর উত্তরসীমা নির্ধারণে বিভিন্ন সংজ্ঞা আছে; তাই মানচিত্রে সব সময় একই রেখা দেখা যায় না। সাধারণভাবে আন্দিজ পর্বতমালার দক্ষিণাংশ, তার পূর্বের মালভূমি ও তৃণভূমি এবং পশ্চিমের দ্বীপমালা ও সমুদ্রখাঁড়ি এর পরিচয়ের অংশ। দক্ষিণে তিয়েরা দেল ফুয়েগোও প্রায়ই বৃহত্তর প্যাটাগোনিয়ার আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
অঞ্চলটির প্রকৃতি বোঝার চাবিকাঠি আন্দিজ পর্বতমালা। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র পশ্চিমা বাতাস পাহাড়ে বাধা পেয়ে ওপরে ওঠে। উচ্চতার সঙ্গে বাতাস ঠান্ডা হলে জলীয় বাষ্প বৃষ্টি বা তুষার হিসেবে ঝরে পড়ে। ফলে পশ্চিমের অনেক ঢাল ও উপত্যকা প্রচুর আর্দ্রতা পায়। পাহাড় পেরিয়ে পূর্বদিকে নামার সময় বাতাস তুলনামূলক শুষ্ক হয়ে যায়। এই বৃষ্টিচ্ছায়ার কারণে পশ্চিমের বনাঞ্চলের কাছাকাছিই পূর্বদিকে বিস্তৃত শুষ্ক তৃণভূমি ও ঝোপভূমি তৈরি হয়েছে।
তাই প্যাটাগোনিয়াকে শুধু বরফে ঢাকা এলাকা ভাবলে তার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। আর্জেন্টিনার পূর্বাঞ্চলীয় প্যাটাগোনিয়ায় নিচু ঝোপ, গুচ্ছ ঘাস, খোলা মালভূমি ও অনাবৃত মাটির বিস্তার দেখা যায়। পানির সীমাবদ্ধতা এবং প্রবল বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে। এই ভূদৃশ্য প্রথম দেখায় অনুর্বর মনে হলেও সেখানে নিজস্ব প্রাণীসম্পদ ও পরিবেশগত সম্পর্ক আছে। বন না থাকা মানেই প্রাণহীনতা নয়; শুষ্ক ভূখণ্ডের জীবনও বিশেষ অভিযোজনের ওপর নির্ভরশীল।
বাতাস এখানে ভূদৃশ্যের সক্রিয় নির্মাতা। দক্ষিণ গোলার্ধের এই অক্ষাংশে পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ সমুদ্র পেরিয়ে তুলনামূলক কম বাধায় এগিয়ে আসে। পাহাড় ও উপত্যকা স্থানীয়ভাবে তার গতি ও দিক বদলে দেয়। উন্মুক্ত এলাকায় বাতাসের শক্তি গাছের বৃদ্ধি, মাটিক্ষয় এবং মানুষের চলাচলে প্রভাব ফেলে। একই দিনে রোদ, মেঘ, বৃষ্টি ও তীব্র হাওয়ার পরিবর্তনও ঘটতে পারে। তবে সমগ্র অঞ্চলকে একই আবহাওয়ার অধীন ভাবা ভুল; উপকূল, উচ্চতা ও অবস্থান অনুযায়ী বড় পার্থক্য রয়েছে।
প্যাটাগোনিয়ার হিমবাহগুলো আরেকটি বিস্ময়। আন্দিজের ওপর জমে থাকা বিশাল বরফক্ষেত্র থেকে অসংখ্য হিমবাহ উপত্যকা ও হ্রদের দিকে নেমে আসে। বছরের পর বছর তুষার জমে সংকুচিত হয়ে বরফ তৈরি করে এবং নিজের ওজনের চাপে ধীরে প্রবাহিত হয়। এই চলমান বরফ পাথর ঘষে, উপত্যকা গভীর করে এবং শিলাখণ্ড বহন করে নিয়ে যায়। আজকের অনেক হ্রদ, প্রশস্ত উপত্যকা ও পাথুরে ঢিবিতে অতীতের বরফযুগের চিহ্ন রয়ে গেছে।
আর্জেন্টিনার লস গ্লাসিয়ারেস জাতীয় উদ্যান এই প্রক্রিয়া দেখার গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানকার পেরিতো মোরেনো হিমবাহের সামনের বরফপ্রাচীর থেকে বড় খণ্ড ভেঙে হ্রদে পড়ে। ঘটনাটি শুধু গলে যাওয়া নয়; হিমবাহের প্রান্ত থেকে বরফ বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও। আবার কোনো হিমবাহের সামনের প্রান্ত কিছু সময় স্থির দেখালেই পুরো অঞ্চলের বরফ স্থিতিশীল বলা যায় না। হিমবাহের পরিবর্তন বুঝতে বরফের পুরুত্ব, মোট ভর, প্রবাহ ও দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণ দরকার।
প্যাটাগোনিয়ার কিছু হ্রদকে দুধমেশানো নীল বা সবুজ দেখায় কেন? হিমবাহ পাথর ঘষে অত্যন্ত সূক্ষ্ম খনিজকণা তৈরি করে। গলিত পানির সঙ্গে এই কণা হ্রদে পৌঁছে আলো ছড়িয়ে দেয়। কণার পরিমাণ, পানির গভীরতা, সূর্যের অবস্থান ও আকাশের প্রতিফলন মিলিয়ে রং বদলায়। সব হ্রদের রঙের কারণ অবশ্য এক নয়। তবু বরফের তৈরি সূক্ষ্ম পলির ভূমিকা বহু হিমবাহজাত হ্রদের বৈশিষ্ট্য বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ।
চিলির তোরেস দেল পাইনে এবং আর্জেন্টিনার ফিৎস রয় অঞ্চলের চূড়াগুলো প্যাটাগোনিয়ার পরিচিত প্রতীক। ভূগর্ভে গঠিত আগ্নেয় শিলা, পর্বতগঠন এবং দীর্ঘ ক্ষয়ের ইতিহাস মিলিয়ে এসব পাহাড়ের বর্তমান অবয়ব তৈরি হয়েছে। বরফ ও আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশ সরিয়ে খাড়া দেয়াল ও ধারালো শীর্ষ উন্মুক্ত করেছে। পশ্চিমের সমুদ্রখাঁড়িগুলোর অনেকও পুরোনো হিমবাহখোদিত উপত্যকা, যেখানে পরে সমুদ্রের পানি ঢুকেছে। পাহাড় থেকে উপকূল পর্যন্ত একই ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের সংযোগ দেখা যায়।
স্থলভাগের প্রাণীদের মধ্যে গুয়ানাকো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উটজাতীয় পরিবারের এই বন্য প্রাণী খোলা ভূখণ্ডে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে এবং ঘাস ও ঝোপজাতীয় খাবার খায়। পুমার খাদ্যতালিকায় গুয়ানাকো গুরুত্বপূর্ণ। আকাশে আন্দীয় কনডর বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকতে পারে। বনাঞ্চলে হুয়েমুল হরিণের মতো প্রাণীর উপস্থিতিও অঞ্চলের বৈচিত্র্য বাড়ায়। তবে সব প্রাণী সব জায়গায় থাকে না; আবাসভেদে তাদের বিস্তার আলাদা।
সমুদ্রতীরের জীবন আবার সম্পূর্ণ অন্য রকম। আটলান্টিক উপকূলের ভালদেস উপদ্বীপ দক্ষিণী রাইট তিমির প্রজনন ও শাবক লালনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সেখানে সামুদ্রিক সিংহ ও দক্ষিণী এলিফ্যান্ট সিলেরও আবাস রয়েছে। প্যাটাগোনিয়ার বিভিন্ন উপকূলে ম্যাজেলানিক পেঙ্গুইনের প্রজনন উপনিবেশ দেখা যায়। সমুদ্রের খাদ্যসম্পদ, উপকূলের গঠন এবং আশ্রয়যোগ্য স্থান এই প্রাণীদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই প্যাটাগোনিয়ার প্রকৃতি শুধু স্থলভাগের সংরক্ষণ দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এই অঞ্চলকে মানুষের স্পর্শহীন শূন্য ভূমি হিসেবে বর্ণনা করাও ঐতিহাসিকভাবে ভুল। তেহুয়েলচে, মাপুচে এবং দক্ষিণের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও ইতিহাস এর সঙ্গে যুক্ত। আর্জেন্টিনার কুয়েভা দে লাস মানোসের শিলাচিত্রে হাতের ছাপ, প্রাণী ও শিকারের দৃশ্য বহু সহস্রাব্দের মানবজীবনের সাক্ষ্য দেয়। ইউরোপীয় উপনিবেশ, রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ, রোগ ও ভূমি দখল আদিবাসী সমাজে গভীর ক্ষতি করে। আজকের খোলা দৃশ্য দেখে সেই ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না।
বর্তমান প্যাটাগোনিয়ায় পর্যটন, পশুপালন, বসতি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি বড় সংরক্ষিত এলাকাও রয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, দাবানল, অতিরিক্ত চারণ এবং কিছু এলাকায় বহিরাগত প্রাণীর প্রভাব পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করে। এর অসাধারণত্ব তাই কেবল মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অল্প দূরত্বে বৃষ্টিভেজা বন থেকে শুষ্ক তৃণভূমি, বরফক্ষেত্র থেকে সমুদ্রের প্রাণীজগতে পৌঁছে যাওয়া পৃথিবীর কার্যপ্রণালি বোঝার সুযোগ দেয়। প্যাটাগোনিয়া দক্ষিণ আমেরিকার প্রান্তে অবস্থিত হলেও প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের বহু কেন্দ্রীয় প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডে দ্বিতীয় চার্লস: আগুন নিয়ন্ত্রণ, জনদুর্দশা ও অগ্নিসংযোগের গুজব
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের চার দিন: সেন্ট পলসসহ হাজারো বাড়ি ধ্বংসের ইতিহাস
১৬৬৬ সালের লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের কারণ: পুডিং লেনের বেকারি থেকে বিপর্যয়ের শুরু
চর্নোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়: ১৯৮৬ সালে কীভাবে ঘটেছিল ভয়াবহ দুর্ঘটনা?
ট্রুম্যানের পারমাণবিক বোমা হামলার সিদ্ধান্ত: ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের অবসান
সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ কত দামে? কোচিং, গৃহশিক্ষা ও শিক্ষার বৈষম্য