লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের পর পুনর্নির্মাণ: ক্রিস্টোফার রেন, সেন্ট পলস ও অগ্নিনিরাপত্তা
সিরিজ: লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ড (১৬৬৬)
পুরোনো পথের ওপর নতুন নির্মাণবিধিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল লন্ডন।
লন্ডনকে আবার গড়ে তোলার সঙ্গে আগের ভুলগুলো বদলানোর যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার উত্তর খোঁজা শুরু হয় ধ্বংসস্তূপ ঠান্ডা হওয়ার আগেই। ঘরহারা মানুষের দ্রুত আশ্রয় দরকার, ব্যবসায়ীদের দরকার দোকান, আর নগর কর্তৃপক্ষের দরকার নিরাপদ নির্মাণের নিয়ম। কিন্তু একই জমিতে আগের চেয়ে ভালো শহর বানাতে গেলে কার জমি কোথায় থাকবে, খরচ কে দেবে এবং কাজ কত দিনে শেষ হবে—এসব প্রশ্ন এড়ানো সম্ভব ছিল না। লন্ডনের পুনর্নির্মাণ তাই স্থাপত্যের পাশাপাশি আইন, অর্থনীতি ও সম্পত্তির অধিকার সামলানোর বিশাল প্রকল্প হয়ে ওঠে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে সবচেয়ে পরিচিত নাম ক্রিস্টোফার রেন। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও স্থাপত্যে তাঁর আগ্রহ ছিল; মহাঅগ্নিকাণ্ডের আগেই পুরোনো সেন্ট পলসের সংস্কার নিয়ে তিনি কাজ করেছিলেন। বিপর্যয়ের পর রেন ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরকে নতুনভাবে সাজানোর প্রস্তাব দেন। তাঁর পরিকল্পনায় প্রশস্ত সড়ক, খোলা চত্বর এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের মধ্যে সুপরিকল্পিত সংযোগের ভাবনা ছিল। জন ইভলিনসহ অন্যরাও নতুন নগরবিন্যাসের প্রস্তাব দেন। আগুনে মুছে যাওয়া এলাকাকে অনেকে দীর্ঘদিনের নগরসমস্যা সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে রেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী গোটা লন্ডন নতুন করে সাজানো হয়েছিল—এটি ভুল ধারণা। মানচিত্রে প্রশস্ত রাস্তা আঁকা সহজ হলেও বাস্তবে সেই রাস্তা বহু ব্যক্তির জমি কেটে এগোত। একই সম্পত্তিতে জমির মালিক, ইজারাদার ও উপভাড়াটের ভিন্ন অধিকার থাকতে পারত। নতুন বিন্যাস কার্যকর করতে বিপুল ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘ আলোচনা এবং সময় দরকার হতো। অথচ ব্যবসা বন্ধ রেখে মানুষ অপেক্ষা করতে পারছিল না। ফলে অধিকাংশ পুনর্নির্মাণ হয় পুরোনো জমির সীমানা ও রাস্তার কাঠামো মেনে।
এর অর্থ অবশ্য পরিবর্তন হয়নি তা নয়। কিছু রাস্তা প্রশস্ত করা হয় এবং নতুন ভবনের আকার ও নির্মাণপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আসে। পুরোনো শহরের পথ অনেকাংশে টিকে গেলেও তার দুই পাশে দাঁড়ানো ভবনের চরিত্র বদলাতে থাকে। পুনর্নির্মাণের সবচেয়ে ব্যাপক সাফল্য ছিল নগরের মানচিত্র সম্পূর্ণ পাল্টানো নয়, বরং একই নগরে আগের চেয়ে নিরাপদ ভবন তৈরির চেষ্টা। জরুরি প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মধ্যে এই আপসই নতুন লন্ডনের ভিত্তি তৈরি করে।
১৬৬৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাস হওয়া পুনর্নির্মাণ আইন এই কাজকে নির্দিষ্ট কাঠামো দেয়। নতুন বাড়ির বাইরের অংশে ইট বা পাথর ব্যবহারের নির্দেশ ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ভবনের শ্রেণি অনুযায়ী তলার সংখ্যা, উচ্চতা এবং দেয়ালের পুরুত্বও নিয়ন্ত্রিত হয়। পাশাপাশি বাড়িগুলোর মধ্যকার বিভাজক দেয়াল কীভাবে তৈরি হবে, সেটিও গুরুত্ব পায়। আগুন একটি ভবন থেকে আরেকটিতে দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ কমাতে শুধু সুন্দর সম্মুখভাগ নয়, ভবনের গঠনও বিবেচনায় আনা হচ্ছিল।
কিন্তু আইনটির অর্থ সব ধরনের কাঠ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা নয়। মেঝে, ছাদের কাঠামো এবং অন্যান্য অংশে কাঠের ব্যবহার অব্যাহত ছিল। ইটের বাইরের দেয়াল আগুনের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করলেও ঘরের ভেতরের দাহ্য বস্তু অদৃশ্য হয়ে যায়নি। ইট-পাথরের শহর মানেই অগ্নিকাণ্ডমুক্ত শহর নয়। নতুন বিধির গুরুত্ব ছিল বিপদ কমানো এবং নির্মাণকে ব্যক্তিগত সুবিধার বাইরেও জননিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখা। ভবনের উপকরণ ও মাপের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাটিতে এই পরিবর্তন কার্যকর করতে জরিপকারীদের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। রবার্ট হুক, রেনের সহযোগী এবং সিটির জরিপকারীদের একজন, জমি মাপা ও পুনর্নির্মাণের কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পোড়া বাড়ির পুরোনো ভিত্তি চিহ্নিত করা, সীমানা নিয়ে বিরোধ সামলানো এবং রাস্তার সঙ্গে নতুন ভবনের অবস্থান মিলিয়ে নেওয়া ছিল কঠিন কাজ। রেনের খ্যাতির আড়ালে এই দৈনন্দিন পরিমাপ ও তদারকির শ্রম প্রায়ই কম আলোচিত হয়। অথচ তা ছাড়া নকশাকে বাস্তব ভবনে রূপ দেওয়া সম্ভব ছিল না।
আরেকটি বাধা ছিল ভাড়ার চুক্তি। অনেক চুক্তিতে বাড়ি মেরামতের দায় ভাড়াটের ওপর থাকত; বাড়ি পুড়ে গেলেও ভাড়া দেওয়ার দাবি উঠতে পারত। যাঁর ব্যবসা ও সঞ্চয় ধ্বংস হয়েছে, তাঁর পক্ষে এমন দায় বহন অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিরোধ মেটাতে প্রতিষ্ঠিত ফায়ার কোর্ট ১৬৬৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু করে। আদালত পুনর্নির্মাণের খরচ, অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য ও চুক্তির শর্ত বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিত। এতে মালিক-ভাড়াটের বিরোধে জমি দীর্ঘদিন ফেলে রাখার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের পুনর্গঠনের পাশাপাশি গির্জাগুলো নিয়ে পৃথক কর্মসূচি এগোয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত সব প্যারিশ গির্জা আগের মতো ফেরত আসেনি; শেষ পর্যন্ত ৫১টি প্যারিশ গির্জা পুনর্নির্মাণ বা মেরামতের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। রেন এই কাজের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তবে নকশা, পরিমাপ ও নির্মাণে হুক এবং অন্য সহযোগীদেরও অবদান ছিল। তাই প্রতিটি গির্জাকে একজন মানুষের একক সৃষ্টি হিসেবে দেখলে সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রকৃতি বোঝা যায় না।
নতুন সেন্ট পলস ছিল সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। পুরোনো ক্যাথেড্রাল মেরামত করা যাবে কি না, নাকি সম্পূর্ণ নতুন ভবন দরকার—এ নিয়ে সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতিতে সময় যায়। রেনের একাধিক নকশা নিয়ে আলোচনা হয়; সব প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। ধর্মীয় ব্যবহারের প্রয়োজন, কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা এবং স্থপতির ভাবনার মধ্যে সমন্বয় করতে হয়েছিল। ১৬৭৫ সালে নতুন ক্যাথেড্রালের নির্মাণ শুরু হয়, অগ্নিকাণ্ডের প্রায় নয় বছর পরে। ফলে আগুন থামার সঙ্গে সঙ্গেই আজকের ভবন তৈরি হতে শুরু করেছিল বলা ঠিক নয়।
মধ্যযুগীয় পূর্বসূরির বদলে নতুন সেন্ট পলসে ধ্রুপদি স্থাপত্যের অনুপাত, স্তম্ভ, খিলান এবং ইংরেজ বারোক রীতির প্রকাশ দেখা যায়। তার প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে বিশাল গম্বুজ। এটিও একটি সরল, একস্তরবিশিষ্ট কাঠামো নয়: ভেতরের দৃশ্যমান গম্বুজ, ওপরের পাথরের লণ্ঠন বহনকারী ইটের শঙ্কু এবং কাঠ ও সিসায় তৈরি বাইরের আবরণের আলাদা ভূমিকা রয়েছে। এই ব্যবস্থায় অভ্যন্তরের অনুপাত ও বাইরে থেকে দেখা অবয়ব—দুই ধরনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছিল।
এত বড় ভবন তৈরিতে দীর্ঘস্থায়ী অর্থায়ন প্রয়োজন ছিল। লন্ডনে আসা কয়লার ওপর শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থ ক্যাথেড্রাল ও গির্জা পুনর্নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৬৯৭ সালে নতুন সেন্ট পলসে উপাসনা শুরু হয়, যদিও তখনও কাজ শেষ হয়নি। ১৭১১ সালে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এই দীর্ঘ সময়রেখা মনে করিয়ে দেয়, লন্ডনের দোকানপাট ও বসতবাড়ির পুনরুদ্ধার এবং তার বৃহত্তম স্মারক স্থাপনার সমাপ্তি একই গতিতে ঘটেনি।
অগ্নিনিরাপত্তার আরেক পরিবর্তন আসে অর্থনৈতিক ক্ষতি সামলানোর ব্যবস্থায়। বিশাল সম্পত্তিহানি মানুষকে আগুনের পরে পুনর্গঠনের খরচ নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। ১৬৮০ সালে নিকোলাস বারবনের ফায়ার অফিস প্রতিষ্ঠা সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রিমিয়ামের বিনিময়ে সম্পত্তির অগ্নিক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবসা বিস্তৃত হতে থাকে। এর ফলে আগুন শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, হিসাবযোগ্য আর্থিক ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচিত হতে শুরু করে।
বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ক্ষতি কমাতে অগ্নিনির্বাপণের লোক নিয়োগ করে। বিমাকৃত বাড়িতে ধাতব প্রতীক বা ফায়ার মার্ক লাগানো হতো, যা প্রতিষ্ঠান ও বিমার পরিচয় বহন করত। তবে ১৬৬৬ সালের পরপরই আধুনিক সরকারি দমকল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বেসরকারি উদ্যোগ, যন্ত্রপাতি ও সংগঠনের উন্নতি ধীরে ধীরে ঘটেছে। নতুন নির্মাণবিধি এবং বিমা-সম্পর্কিত অগ্নিনির্বাপণ ছিল দীর্ঘ পরিবর্তনের অংশ; একবারে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা এনে দেওয়া সমাধান নয়।
রেন ও হুকের পরিকল্পনায় নির্মিত মনুমেন্ট ১৬৭৭ সালে উন্মুক্ত হয় এবং বিপর্যয়ের স্মৃতি নগরের দৃশ্যমান অংশে স্থান পায়। কিন্তু পুনর্জন্মের প্রতীকগুলোর পাশেই ছিল বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম। ১৬৭৬ নাগাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অধিকাংশ পুনর্নির্মিত হলেও সবার জীবনে সমানভাবে স্বস্তি ফেরেনি। লন্ডন বদলেছিল নতুন ইটের দেয়াল, নিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, সম্পত্তিবিরোধ নিষ্পত্তি ও ঝুঁকি ভাগ করার ব্যবস্থায়। পুরোনো পথ অনেকটাই রয়ে গিয়েছিল; সেই পথের পাশে দাঁড়ানো শহরটি শিখেছিল, দুর্যোগের স্মৃতি টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় ভবিষ্যতের বিপদ কমানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের চার দিন: সেন্ট পলসসহ হাজারো বাড়ি ধ্বংসের ইতিহাস
১৬৬৬ সালের লন্ডনের মহাঅগ্নিকাণ্ডের কারণ: পুডিং লেনের বেকারি থেকে বিপর্যয়ের শুরু
চর্নোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়: ১৯৮৬ সালে কীভাবে ঘটেছিল ভয়াবহ দুর্ঘটনা?
ট্রুম্যানের পারমাণবিক বোমা হামলার সিদ্ধান্ত: ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের অবসান
সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ কত দামে? কোচিং, গৃহশিক্ষা ও শিক্ষার বৈষম্য