বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পিকিং কনভেনশন ও আফিম যুদ্ধের উত্তরাধিকার: আধুনিক চীন কীভাবে বদলে গেল?

সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত

পিকিং কনভেনশন ও আফিম যুদ্ধের উত্তরাধিকার: আধুনিক চীন কীভাবে বদলে গেল?
অসম চুক্তির ক্ষত, হংকংয়ের পরিবর্তন ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ ইতিহাস।

ইউয়ানমিংইউয়ানের আগুন নিভে যাওয়ার পরেও চিং সাম্রাজ্যের সংকট শেষ হয়নি। বেইজিংয়ের কাছে বিদেশি বাহিনী অবস্থান করছিল, সম্রাট শিয়ানফেং চেংদেতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, আর প্রিন্স গংকে সামরিক পরাজয়ের মধ্যে আলোচনা চালাতে হচ্ছিল। ১৮৬০ সালের অক্টোবরে পিকিং কনভেনশন সেই আলোচনার ফলকে লিখিত রূপ দেয়। যুদ্ধের সমাপ্তি চীনের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়নি; বরং বিদেশি অধিকার, আর্থিক দায় ও ভূখণ্ড হস্তান্তরের নতুন শর্ত স্থায়ী করেছিল। এখান থেকেই আফিম যুদ্ধের দীর্ঘ উত্তরাধিকার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পিকিং কনভেনশনও একটিমাত্র অভিন্ন দলিল ছিল না। ব্রিটেনের সঙ্গে চুক্তি হয় ২৪ অক্টোবর এবং ফ্রান্সের সঙ্গে ২৫ অক্টোবর। এগুলো ১৮৫৮ সালের তিয়ানজিন চুক্তিকে কার্যকর করার বাধা দূর করে এবং নতুন শর্ত যোগ করে। প্রিন্স গং চীনা পক্ষে, লর্ড এলগিন ও ব্যারন গ্রো নিজ নিজ দেশের পক্ষে আলোচনা করেন। রাজধানীর সামনে সেনাবাহিনী রেখে সম্পাদিত এই ব্যবস্থায় চীনের দরকষাকষির সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। শান্তি পাওয়ার বিনিময়ে দরবারকে আরও ছাড় দিতে হয়।

ক্ষতিপূরণ ছিল বড় বোঝা। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পাওনা পৃথকভাবে আশি লাখ তায়েল রুপা নির্ধারিত হয়। এটি আগের ক্ষতিপূরণের অঙ্ক সংশোধন করে স্থির করা হয়েছিল; পুরোনো পুরো অঙ্কের সঙ্গে আবার আশি লাখ যোগ করার ব্যবস্থা ছিল না। তায়েল ছিল ওজনভিত্তিক রুপার হিসাব। অর্থ সংগ্রহের চাপ রাজস্বব্যবস্থায় পড়ে, আর পরিশোধ নিশ্চিত করতে বিদেশি বাহিনীর কিছু অবস্থান ধরে রাখার সুযোগও ছিল। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও সামরিক চাপ পুরোপুরি সরেনি।

ব্রিটিশ চুক্তিতে দক্ষিণ কাউলুন ও স্টোনকাটার্স দ্বীপ হংকং উপনিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৮৪২ সালে পাওয়া হংকং দ্বীপের বিপরীত তীরে এই সম্প্রসারণ বন্দর ও নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে বর্তমান হংকংয়ের সব অঞ্চল তখনও ব্রিটিশ অধীনে যায়নি। হংকং দ্বীপের হস্তান্তর, দক্ষিণ কাউলুনের হস্তান্তর এবং নিউ টেরিটরিজের ইজারা তিনটি পৃথক ঐতিহাসিক ঘটনা। এগুলোকে একসঙ্গে দেখলে ব্রিটিশ সম্প্রসারণের ধাপ এবং পরবর্তী প্রত্যাবর্তনের জটিলতা বোঝা যায় না।

নিউ টেরিটরিজ ও সংশ্লিষ্ট দ্বীপগুলোর নিরানব্বই বছরের ইজারা হয় ১৮৯৮ সালে। পরবর্তী সময়ে হংকংয়ের অর্থনীতি, বসতি ও অবকাঠামো এই অঞ্চলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রশ্ন পুরো হংকংয়ের ভবিষ্যৎ আলোচনায় কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালের চীন-ব্রিটিশ যৌথ ঘোষণার ভিত্তিতে ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই সমগ্র হংকং চীনের সার্বভৌমত্বে ফিরে আসে। তাই প্রত্যাবর্তনকে শুধু ১৮৪২ সালের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বলা ভুল; সেই হস্তান্তরে নিরানব্বই বছরের মেয়াদ ছিল না।

হংকংয়ের বাইরে বিদেশি প্রভাবের প্রধান ক্ষেত্র ছিল চুক্তিবন্দরগুলো। তিয়ানজিন বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত হয়, অন্য বন্দরে ব্যবসা ও বসবাসের অধিকার বিস্তৃত হয় এবং বেইজিংয়ে বিদেশি দূতাবাসের স্থায়ী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে চীনের সরকার আন্তর্জাতিক কূটনীতির আরও প্রত্যক্ষ চাপের মুখে পড়ে। কিন্তু বন্দর খোলা মানেই সব বন্দর বিদেশি ভূখণ্ডে পরিণত হওয়া নয়। চীনা প্রশাসন বহাল থাকলেও বিশেষ অধিকার, বসতি ও বিদেশি সুরক্ষার কারণে কর্তৃত্বের মধ্যে নানা বিভাজন তৈরি হয়।

বিচারিক সুবিধা সেই বিভাজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আগের চুক্তিগুলোতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায় অনেক বিদেশির বিচার চীনা আদালতের পরিবর্তে তাঁদের নিজস্ব কনস্যুলার কর্তৃপক্ষ করত। একই শহরে বাস করেও মানুষ ভিন্ন বিচারিক ব্যবস্থার অধীন থাকতে পারত। সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের অধিকার আবার নতুন ছাড় অন্য শক্তির কাছে ছড়িয়ে দিত। ফলে চীনের সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের আলোচনা শুধু দ্বিপক্ষীয় থাকত না। একবার দেওয়া সুবিধা প্রত্যাহার বা সংশোধন করাও ক্রমে কঠিন হয়ে ওঠে।

অর্থনীতির পরিবর্তন অবশ্য একরৈখিক ছিল না। বিদেশি পণ্য ও পরিবহন স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে, আবার নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তির সুযোগও তৈরি করে। সাংহাইয়ের মতো শহরে চীনা ব্যবসায়ীরাও এই ব্যবস্থার মধ্যে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সব অঞ্চলে একই প্রভাব পড়েনি, সব শিল্পও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বন্দরনগরের সমৃদ্ধি এবং অসম রাজনৈতিক ক্ষমতা পাশাপাশি চলতে পারে—চুক্তিবন্দরগুলোর ইতিহাসে এই বাস্তবতা বিশেষভাবে দেখা যায়।

আফিমের উত্তরাধিকারও আমদানির হিসাবের বাইরে ছড়ায়। ১৮৫৮ সালের শুল্কব্যবস্থার পরে আমদানি বৈধ কাঠামো পায়, আর পরবর্তী দশকগুলোতে চীনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ে। আসক্তি, পরিবারের ব্যয় এবং কৃষিজমির ব্যবহার নিয়ে সমস্যা গভীর হয়। কিছু প্রশাসন আফিম থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করায় নিষেধাজ্ঞার নীতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। তবে চীনের সব অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ আফিম ছিল না; গৃহযুদ্ধ, জনসংখ্যার চাপ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও রাজস্বসংকটও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিদেশি অনুপ্রবেশ কেবল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৮৬০ সালের পৃথক চীন-রাশিয়া পিকিং চুক্তিতে উসুরি নদীর পূর্ব দিকের ভূখণ্ডে রুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। রাশিয়া অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনীর মতো বেইজিং অভিযানের প্রধান যোদ্ধা না হয়েও চীনের দুর্বলতার সুবিধা পায়। পরবর্তী দশকগুলোতে অন্য শক্তিও বন্দর, ইজারা ও বিশেষ সুবিধা দাবি করে। আফিম যুদ্ধ এই সম্প্রসারণের পথ প্রশস্ত করেছিল, যদিও প্রতিটি পরবর্তী ঘটনার নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক কারণ ছিল।

চিং নেতৃত্বের একাংশ পরাজয় থেকে সংস্কারের প্রয়োজনও বুঝতে পারেন। ১৮৬১ সালে বিদেশি সম্পর্ক পরিচালনার জন্য জংলি ইয়ামেন প্রতিষ্ঠিত হয়। আত্মশক্তিবৃদ্ধির উদ্যোগে আধুনিক অস্ত্রকারখানা, জাহাজ নির্মাণ, ভাষাশিক্ষা ও প্রযুক্তি গ্রহণের চেষ্টা বাড়ে। প্রিন্স গং, জেং গুওফান, লি হংঝাং এবং জুও জংতাংয়ের মতো ব্যক্তিরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। চীনারা শুধু বিদেশি চাপের নিষ্ক্রিয় শিকার ছিলেন না; তাঁরা অভিযোজন, প্রতিরোধ ও সংস্কারের পথও খুঁজেছিলেন।

কিন্তু নতুন অস্ত্র ও কারখানা তৈরি করলেই প্রশাসনের সব সমস্যা মিটত না। অর্থসংস্থান, প্রাদেশিক প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বে সীমাবদ্ধতা ছিল। ১৮৯৪–১৮৯৫ সালের চীন-জাপান যুদ্ধে পরাজয় সংস্কারের ফল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে। পরে সাংবিধানিক সংস্কার ও বিপ্লবের দাবি বাড়ে। চিং রাজবংশের ১৯১১ সালের পতনের সঙ্গে এই দীর্ঘ দুর্বলতার সম্পর্ক ছিল, কিন্তু আফিম যুদ্ধ থেকেই পতন অনিবার্য হয়ে গিয়েছিল—এমন ধারণা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে।

যুদ্ধ ও অসম চুক্তির স্মৃতি জাতীয়তাবাদে গভীর প্রভাব ফেলে। হংকংয়ের বিচ্ছিন্নতা, বিদেশি বিচারিক সুবিধা এবং ইউয়ানমিংইউয়ানের ধ্বংস সার্বভৌমত্ব হারানোর প্রতীক হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো এই স্মৃতিকে রাষ্ট্র শক্তিশালী করা ও বিদেশি সুবিধা বাতিলের দাবির সঙ্গে যুক্ত করে। “জাতীয় অপমানের শতাব্দী” ধারণায় আফিম যুদ্ধ সূচনাবিন্দু হিসেবে স্থান পায়। এই স্মৃতি বাস্তব ক্ষতির ওপর দাঁড়ালেও পরবর্তী যুগে তার ব্যাখ্যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও রাষ্ট্রগঠনের চাহিদা অনুযায়ীও বদলেছে।

অসম চুক্তির অধিকারও একদিনে শেষ হয়নি। আলোচনা, যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেগুলো ধাপে ধাপে বিলুপ্ত হয়। ১৯৪৩ সালে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র চীনে নিজেদের বিচারিক বিশেষ অধিকার পরিত্যাগ করে। হংকংয়ের প্রত্যাবর্তন ঘটে আরও পরে। এই দীর্ঘ সময়ক্রম দেখায়, সামরিক পরাজয়ে দেওয়া ছাড় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বহু প্রজন্মের জীবনে প্রভাব রাখতে পারে। সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার ছিল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।

চায়ের মূল্য মেটাতে রুপা, ভারতীয় আফিমের বিস্তার, হুমেনের দমন অভিযান এবং দুই দফা যুদ্ধ—এই ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত চীনের ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থায়ী চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবু আধুনিক চীনের ইতিহাস শুধু পরাজয়ের ইতিহাস নয়; এর মধ্যে আছে বাণিজ্যিক উদ্যোগ, সংস্কারের চেষ্টা, বিপ্লব ও অধিকার পুনরুদ্ধার। আফিম যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার হলো রাষ্ট্রের শক্তি, বিদেশি সম্পর্ক ও সার্বভৌমত্বকে নতুনভাবে ভাবার বাধ্যবাধকতা। যুদ্ধজাহাজ চলে যাওয়ার বহু পরেও সেই প্রশ্নগুলো চীনের ইতিহাসকে পরিচালিত করেছে।