ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান
সিরিজ: ইনকা সাম্রাজ্যের পতন
ভিলকাবাম্বার পতনে শেষ হয় স্বাধীন ইনকা রাষ্ট্রের দীর্ঘ প্রতিরোধ।
কুসকো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মানকো ইনকা যে দুর্গম অঞ্চলে সরে গিয়েছিলেন, সেখানেই স্বাধীন রাজবংশীয় শাসনের নতুন কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ভিলকাবাম্বার পাহাড়, অরণ্য ও নদী তাঁকে রাজধানী ফেরত দেয়নি, কিন্তু স্প্যানিশদের নাগালের বাইরে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার সুযোগ দিয়েছিল। ১৫৩৭ সালের পশ্চাদপসরণ তাই ইনকা স্বাধীনতার তাৎক্ষণিক সমাপ্তি ছিল না; সেটি ছিল সংকুচিত ভূখণ্ডে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার সূচনা। পরবর্তী প্রায় সাড়ে তিন দশক এই রাষ্ট্র যুদ্ধ, আলোচনা এবং অনিশ্চিত সমঝোতার মধ্যে বেঁচে থাকবে।
ভিলকাবাম্বা বলতে একটি বিস্তৃত অঞ্চল এবং তার শেষ রাজধানী—দুটোকেই বোঝানো হয়। কুসকোর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই অঞ্চলে উঁচু পাহাড় থেকে আর্দ্র অরণ্যময় নিচু ভূমি পর্যন্ত বিচিত্র পরিবেশ ছিল। ভিতকোসসহ একাধিক বসতি শাসন ও ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। শেষ রাজধানীর সঙ্গে বর্তমানে এসপিরিতু পাম্পা প্রত্নস্থলকে যুক্ত করা হয়। মাচু পিচুই ইনকাদের শেষ প্রতিরোধকেন্দ্র ছিল—এই জনপ্রিয় ধারণা সঠিক নয়। ভিলকাবাম্বার রাষ্ট্রের নিজস্ব বসতি, কৃষিজমি, যোগাযোগপথ ও স্থানীয় সম্পর্ক ছিল।
এখানে মানকো বৃহৎ সাম্রাজ্যের সব প্রতিষ্ঠান আগের আকারে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন জনসংখ্যা ও সম্পদ সীমিত ছিল। তবু রাজদরবার, অভিজাত অনুচর, ধর্মীয় আচার এবং সামরিক সংগঠনের মাধ্যমে রাজবংশের কর্তৃত্ব বজায় থাকে। আশপাশের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কও রাষ্ট্রটির অস্তিত্বে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্প্যানিশ অধিকৃত অঞ্চলে আক্রমণ ও যোগাযোগের পথ ব্যাহত করার সুযোগ থাকায় ভিলকাবাম্বা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের জন্য স্থায়ী উদ্বেগ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কুসকোর বিকল্প বৈধতার দাবিও সেখানে জীবিত থাকে।
১৫৪৪ সালে মানকো ইনকা নিহত হন। হত্যাকারীরা ছিলেন স্প্যানিশদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে বিপর্যস্ত আলমাগ্রোপন্থী আশ্রয়প্রার্থী, যাঁদের তিনি নিজের অঞ্চলে থাকতে দিয়েছিলেন। সম্পর্কের এই মর্মান্তিক পরিণতি দেখায়, স্প্যানিশ পক্ষগুলোর বিরোধ কাজে লাগানোর নীতিও বিপজ্জনক ছিল। মানকোর মৃত্যুর পর তাঁর অল্পবয়সী পুত্র সাইরি তুপাক উত্তরসূরি হন; বাস্তবে অভিভাবক ও অভিজাতদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রটি টিকে গেলেও প্রতিষ্ঠাতা শাসকের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব আর রইল না।
স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ ভিলকাবাম্বার সমস্যা শুধু যুদ্ধ দিয়ে সমাধান করতে চায়নি। রাজপরিবারকে সম্পত্তি, আয় ও মর্যাদা দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নিয়ে আসার চেষ্টা চলে। দীর্ঘ আলোচনার পর সাইরি তুপাক ১৫৫৭ সালে ভিলকাবাম্বা ত্যাগ করেন এবং পরের বছর ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খ্রিস্টীয় বাপ্তিস্ম গ্রহণের পাশাপাশি তিনি ইউকাই অঞ্চলে সম্পত্তি ও সুবিধা পান। এই সমঝোতা একজন রাজপুত্রকে ঔপনিবেশিক সমাজে স্থান দিলেও ভিলকাবাম্বার স্বাধীন কেন্দ্র বিলুপ্ত করেনি।
ভিলকাবাম্বায় কর্তৃত্ব ধরে রাখেন মানকোর আরেক পুত্র তিতু কুসি ইউপানকি। সাইরি তুপাকের প্রস্থানের পর তাঁর নেতৃত্ব কার্যকর হয় এবং ১৫৬১ সালে সাইরির মৃত্যুর পর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। তিতু কুসি সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি আলোচনাকে গুরুত্ব দেন। ১৫৬৬ সালের আকোবাম্বা চুক্তিতে স্প্যানিশ রাজমুকুটের সঙ্গে আনুগত্য, শান্তি এবং ধর্মীয় যোগাযোগের শর্ত নির্ধারিত হয়। তবে চুক্তির ভাষা ও বাস্তব নিয়ন্ত্রণ এক ছিল না; তিতু কুসি নিজের ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব বজায় রাখেন।
তাঁর সময় খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকেরা ভিলকাবাম্বায় প্রবেশ করেন এবং তিতু কুসিও বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু এর অর্থ পুরোনো বিশ্বাস ও আচার সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা নয়। উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস থেকে যায়। তিতু কুসি নিজের পারিবারিক ইতিহাস এবং স্প্যানিশদের আচরণের বিবরণও লিখিয়ে রাখেন। ইনকাদের দৃষ্টিভঙ্গি সংরক্ষণে তাঁর বর্ণনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিজয়ের ইতিহাসের বড় অংশই বিজেতাদের কলমে লেখা। আলোচনার মধ্যেও তিনি রাজবংশের ক্ষতি ও অধিকার তুলে ধরছিলেন।
১৫৭১ সালে তিতু কুসির আকস্মিক মৃত্যু পরিস্থিতি বদলে দেয়। তাঁর অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে সন্দেহ ছড়ায়; উপস্থিত স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে বিষপ্রয়োগ বা ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। ধর্মযাজক দিয়েগো ওর্তিস এবং দোভাষী মার্তিন পান্দো নিহত হন। এই মৃত্যুগুলো ভিলকাবাম্বা ও ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সম্পর্ককে তীব্র সংকটে ঠেলে দেয়। তিতু কুসির পর তাঁর ভাই তুপাক আমারু প্রথম শাসক হন। পূর্বসূরির মৃত্যুর অনিশ্চয়তা ও বাইরের চাপ—দুটিই তাঁকে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করতে হয়।
এদিকে পেরুর ভাইসরয় ফ্রান্সিসকো দে তোলেদো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব সংহত করার কর্মসূচি চালাচ্ছিলেন। শ্রম, কর, বসতি এবং প্রশাসন পুনর্গঠনের বৃহত্তর পরিকল্পনায় একটি স্বাধীন ইনকা রাজদরবার অস্বস্তিকর ব্যতিক্রম ছিল। ভিলকাবাম্বা শুধু সীমান্তের সামরিক সমস্যা নয়; স্প্যানিশ শাসনের বাইরে রাজবংশীয় বৈধতার কেন্দ্রও ছিল। তোলেদোর কাছে সমঝোতার অনিশ্চয়তা শেষ করে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা তাই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্প্যানিশ দূতদের ওপর হামলা এবং যোগাযোগের ব্যর্থতা যুদ্ধের তাৎক্ষণিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সব ঘটনার দায় নতুন শাসক তুপাক আমারুর ব্যক্তিগত নির্দেশে ঘটেছিল বলে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। আলোচনার ভাঙনকে বৃহত্তর ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। ১৫৭২ সালে তোলেদো সামরিক অভিযান অনুমোদন করেন। লক্ষ্য ছিল শুধু প্রতিশোধ নয়, স্বাধীন রাষ্ট্রের অবকাঠামো ও নেতৃত্ব দখল করে ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া।
অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন মার্তিন উর্তাদো দে আরবিয়েতো। তাঁর বাহিনীতে স্প্যানিশদের পাশাপাশি স্থানীয় সহযোগীরাও ছিলেন। দুর্গম পথে চলা, নদী পার হওয়া এবং খাদ্য সরবরাহের জন্য তাঁদের জ্ঞান ও শ্রম অপরিহার্য ছিল। ইনকারা প্রতিরক্ষা গড়লেও দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ যুদ্ধ চালানোর মতো সম্পদ সীমিত ছিল। অভিযাত্রীরা নদী ও পাহাড়ি বাধা অতিক্রম করে ভেতরে এগোয়। কয়েক দশক আগে যে ভূগোল মানকোকে নিরাপত্তা দিয়েছিল, এবার সেটিও অপ্রবেশ্য প্রাচীর হয়ে থাকতে পারেনি।
১৫৭২ সালের জুনে স্প্যানিশ বাহিনী ভিলকাবাম্বার রাজধানীতে পৌঁছায়। শাসক ও তাঁর অনুগামীরা সরে গিয়েছিলেন; শহরের অংশ পোড়ানো বা ধ্বংস করা হয়েছিল। রাজধানী দখল সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তুপাক আমারু মুক্ত থাকা পর্যন্ত রাজবংশীয় নেতৃত্ব অন্যত্র পুনর্গঠিত হতে পারত। তাই অনুসরণ চলতে থাকে। স্বাধীন রাষ্ট্রের পতন এবং তার শাসকের বন্দিত্ব ছিল সম্পর্কিত, কিন্তু পৃথক ঘটনা। প্রথমটি ঘটার পর দ্বিতীয়টি নিশ্চিত করতে স্প্যানিশরা আরও দূরে অভিযান চালায়।
মার্তিন গার্সিয়া ওনিয়েস দে লোয়োলার নেতৃত্বে অনুসরণকারী দল তুপাক আমারুকে খুঁজে পায় এবং বন্দি করে। তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও অনুচরেরাও ছিলেন। অনুসরণের পথ ও বন্দিত্বের কিছু বিবরণে পার্থক্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে কুসকোতে আনা হয়। যে রাজধানী তাঁর পিতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন, সেখানেই তিনি এখন বন্দি শাসক। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি প্রকাশ্যে রাজবংশের স্বাধীন দাবির পরিণতি দেখানোর সুযোগ পেয়েছিল।
তুপাক আমারুর বিরুদ্ধে বিচার চলে এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর ব্যক্তিগত দায়, অভিযুক্ত ঘটনাগুলোয় তাঁর ভূমিকা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। প্রাণরক্ষার আবেদনও সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি। ১৫৭২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কুসকোর প্রধান প্রাঙ্গণে তাঁকে শিরশ্ছেদ করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেন। তাঁর শেষ বক্তব্য ও জনতার প্রতিক্রিয়ার নাটকীয় বর্ণনা আছে, তবে সব সংলাপকে হুবহু ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
এই মৃত্যুদণ্ডের তাৎপর্য ছিল স্বাধীন রাজদরবারের অবসান। রাজবংশের সব সদস্য নিশ্চিহ্ন হননি; অনেক উত্তরসূরি ঔপনিবেশিক সমাজে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু নিজস্ব ভূখণ্ড, সেনাশক্তি ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বসহ ভিলকাবাম্বার রাষ্ট্র আর রইল না। আটক, নির্বাসন এবং নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অবশিষ্ট ক্ষমতাকেন্দ্রও দুর্বল করা হয়। ১৫৩২ সালের কাহামার্কায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর আঘাত এসেছিল; ১৫৭২ সালে শেষ স্বাধীন উত্তরসূরি রাষ্ট্রটিও দখল হলো।
তবু ইনকা শাসনের অবসান আন্দীয় মানুষের ইতিহাসের অবসান নয়। কেচুয়া ভাষা, কৃষিজ্ঞান, বস্ত্রশিল্প, সামাজিক সম্পর্ক এবং স্মৃতির বহু ধারা টিকে থাকে ও বদলে যায়। তুপাক আমারুর নামও পরবর্তী প্রতিরোধে ফিরে আসে। ১৭৮০ সালের বিদ্রোহের নেতা তুপাক আমারু দ্বিতীয় ছিলেন ভিন্ন ব্যক্তি, যিনি শেষ স্বাধীন ইনকা শাসকের নাম ধারণ করেছিলেন। কুসকো থেকে বিস্তৃত সাম্রাজ্যের যাত্রা ভিলকাবাম্বায় রাষ্ট্র হিসেবে শেষ হয়েছিল; তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং স্বাধীনতার স্মৃতি শেষ হয়নি।
পিকিং কনভেনশন ও আফিম যুদ্ধের উত্তরাধিকার: আধুনিক চীন কীভাবে বদলে গেল?
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
কাহামার্কার যুদ্ধ: আতাহুয়ালপার বন্দিত্ব, মুক্তিপণ ও হত্যার ইতিহাস