ফ্রান্সিসকো পিজারোর পেরু অভিযান: অল্প সৈন্যে ইনকা জয়ের সূচনা
সিরিজ: ইনকা সাম্রাজ্যের পতন
পানামা থেকে আন্দিজের পথে পিজারোর বাহিনী—ইনকা বিজয়ের অভিযানের সূচনা।
হুয়াসকারকে পরাজিত করে আতাহুয়ালপা যখন ইনকা সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার পথে, তখন প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল থেকে আন্দিজের দিকে এগিয়ে আসছিল একটি ছোট বিদেশি বাহিনী। আগের কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধ তাদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তটি বুঝতে সামান্য পেছনে ফিরতে হয়। ফ্রান্সিসকো পিজারোর পেরু অভিযান আকস্মিক কোনো সাহসী পদক্ষেপ ছিল না; এর পেছনে ছিল বহু বছরের অনুসন্ধান, ব্যর্থতা, অর্থসংগ্রহ এবং ক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা। কাজামার্কায় পৌঁছানোর আগেই সেই পরিকল্পনার জন্য অনেক মানুষ জীবন হারিয়েছিল।
স্পেনের এক্সত্রেমাদুরার ত্রুহিয়োতে জন্ম নেওয়া পিজারো আমেরিকায় এসেছিলেন সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার সুযোগ খুঁজতে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং মধ্য আমেরিকার স্প্যানিশ অভিযানের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৫১৩ সালে ভাসকো নুনিয়েস দে বালবোয়ার সঙ্গে পানামার স্থলভাগ অতিক্রম করে প্রশান্ত মহাসাগর দেখার অভিযানে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে পানামায় তাঁর সম্পত্তি ও প্রভাব তৈরি হয়। ফলে দক্ষিণের অজানা ভূখণ্ডে যাত্রার সময় তিনি সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ভাগ্যান্বেষী ছিলেন না।
পানামা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর স্প্যানিশদের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল ধরে দক্ষিণে যাওয়ার সুযোগ খুলে যায়। অভিযাত্রী ও স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যমে সোনা এবং সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর খবর আসছিল। একই সময়ে মেক্সিকোয় এরনান কোর্তেসের সাফল্য দেখিয়েছিল, শক্তিশালী আমেরিকান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযান ব্যক্তিগত সম্পদ ও রাজকীয় মর্যাদা এনে দিতে পারে। তবে পিজারোর কাছে শুরুতেই ইনকা সাম্রাজ্যের সঠিক মানচিত্র বা রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। সম্পদের সংবাদ আগে এসেছিল, সাম্রাজ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান এসেছে ধীরে ধীরে।
অভিযানের জন্য পিজারো জোট গড়েন দিয়েগো দে আলমাগ্রো এবং ধর্মযাজক এরনান্দো দে লুকের সঙ্গে। পিজারো মূল অভিযাত্রী দলের নেতৃত্ব দিতেন, আলমাগ্রো জনবল ও সরবরাহ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন, আর লুকে অর্থায়ন ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের পেছনে অন্য বিনিয়োগকারীর স্বার্থও ছিল। এই ব্যবস্থা বোঝা জরুরি: অভিযানটি সম্পূর্ণ রাজকোষের অর্থে পরিচালিত নিয়মিত সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ছিল না। ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ সম্পদ ভাগের প্রত্যাশা এর চালিকাশক্তি ছিল।
১৫২৪ সালে প্রথম দক্ষিণমুখী অভিযান শুরু হয়। কিন্তু বর্তমান কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল ধরে যাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। প্রবল বৃষ্টি, ঘন বন, খাদ্যাভাব এবং স্থানীয় প্রতিরোধ ছোট দলটিকে বিপর্যস্ত করে। সৈন্যদের অনেকে মারা যায় বা অসুস্থ হয়। আলমাগ্রোও সংঘর্ষে একটি চোখের দৃষ্টি হারান। প্রথম যাত্রায় কোনো সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য দখল করা যায়নি। বরং স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সমুদ্রপথে দক্ষিণে নামা এবং সেখানে টিকে থাকা দুটি আলাদা সমস্যা।
১৫২৬ সালে দ্বিতীয় অভিযান শুরু হলে অনুসন্ধানের পরিধি বাড়ে। নাবিক বার্তোলোমে রুইস আরও দক্ষিণে গিয়ে আদিবাসী বণিকদের একটি বড় পালতোলা ভেলার মুখোমুখি হন। সেখানে সূক্ষ্ম বস্ত্র, ধাতব সামগ্রী এবং সুসংগঠিত বিনিময়ব্যবস্থার চিহ্ন পাওয়া যায়। এসব বস্তু দক্ষিণের সম্পদ সম্পর্কে আগের সংবাদকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের আটক করে ভাষা শেখানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তী অভিযানে দোভাষীরা অপরিহার্য হয়ে ওঠেন, যদিও তাঁদের অবস্থান ছিল চাপ, অসম ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে জটিল।
এই যাত্রাও দুর্ভোগমুক্ত ছিল না। গাইয়ো দ্বীপে খাদ্যসংকট ও অসন্তোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পানামা থেকে অভিযাত্রীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রচলিত কাহিনিতে পিজারো বালিতে রেখা টেনে সম্পদের সন্ধানে থেকে যাওয়া এবং নিরাপদে ফিরে যাওয়ার মধ্যে পছন্দ করতে বলেন; তেরোজন তাঁর সঙ্গে থাকেন। “বিখ্যাত তেরোজনের” ঘটনায় ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকলেও নাটকীয় সংলাপগুলো নিশ্চিতভাবে যাচাইযোগ্য নয়। পরবর্তী বীরত্বগাথা থেকে বাস্তব অভিযানের দুর্দশাকে আলাদা করে দেখা দরকার।
অবশেষে তুম্বেস অঞ্চলে পৌঁছে স্প্যানিশরা উন্নত বসতি, প্রশাসনিক সংগঠন এবং ইনকা প্রভাবের প্রত্যক্ষ পরিচয় পায়। এতদিনের গুজবের তুলনায় এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। পিজারো এখন সম্ভাব্য সম্পদের নমুনা এবং স্থানীয় সমাজ সম্পর্কে কিছু তথ্য নিয়ে স্পেনে সাহায্য চাইতে পারেন। কিন্তু তাঁর উপলব্ধি তখনো অসম্পূর্ণ ছিল। বাইরে থেকে দেখা সমৃদ্ধি দিয়ে সাম্রাজ্যের সেনাশক্তি, প্রাদেশিক সম্পর্ক কিংবা রাজবংশীয় সংকটের গভীরতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব ছিল না।
পানামার কর্তৃপক্ষের সীমিত সমর্থন কাটাতে পিজারো সরাসরি স্প্যানিশ রাজদরবারে যান। ১৫২৯ সালের ২৬ জুলাইয়ের তোলেদো চুক্তি তাঁকে পেরু বা নুয়েভা কাস্তিয়া নামে চিহ্নিত অঞ্চলে অভিযান, বিজয় ও বসতি স্থাপনের রাজকীয় অনুমতি দেয়। সম্রাট পঞ্চম চার্লসের শাসনামলে রানি ইসাবেলা এই অনুমোদনে স্বাক্ষর করেন। পিজারো গভর্নরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ পান। তবে স্প্যানিশ রাজমুকুটের অনুমতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি ছিল না; এটি ছিল তাঁদের ভূখণ্ড দখলের ইউরোপীয় দাবি।
রাজকীয় অনুমোদন অভিযানের বৈধতা ও লোকসংগ্রহে সুবিধা দিলেও বিপুল সেনাবাহিনী এনে দেয়নি। পিজারো নিজের পরিবার ও পরিচিতদের ওপর নির্ভর করেন; তাঁর ভাইয়েরাও অভিযানে যুক্ত হন। অন্যদিকে পদমর্যাদার বণ্টনে আলমাগ্রোর অসন্তোষ ভবিষ্যৎ বিরোধের ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ ইনকা সাম্রাজ্যে প্রবেশের আগেই স্প্যানিশ অংশীদারদের মধ্যে ক্ষমতা ও লাভ নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। তাঁদের ঐক্যও নিঃশর্ত ছিল না।
১৫৩১ সালের শুরুতে পিজারো তৃতীয় অভিযানে পানামা ত্যাগ করেন। সাধারণ হিসাবে তাঁর সঙ্গে ছিল প্রায় ১৮০ জন মানুষ এবং ২৭টি ঘোড়া, যদিও বিবরণভেদে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন দল এসে যোগ দেয়। বর্তমান ইকুয়েডরের উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়ার সময় খাদ্যসংগ্রহ, লুণ্ঠন, অসুস্থতা ও সংঘর্ষ চলতে থাকে। কোয়াকে অঞ্চলে সংগৃহীত মূল্যবান সামগ্রীর কিছু অংশ দিয়ে আরও লোক ও সরঞ্জাম আনার ব্যবস্থা করা হয়। অভিযান নিজের পরবর্তী ধাপের খরচও দখল করা সম্পদ থেকে মেটাচ্ছিল।
পুনা দ্বীপ এবং তুম্বেস অঞ্চলে পিজারো স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের মুখোমুখি হন। কখনো আলোচনার মাধ্যমে, কখনো বলপ্রয়োগে তিনি এগিয়ে যান। আগের সফরের পরিচিত সমৃদ্ধ তুম্বেসের পরিবর্তিত অবস্থা তাঁকে দেখায়, সাম্প্রতিক সংঘর্ষ উপকূলেও প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু সব স্থানীয় নেতা একই উদ্দেশ্যে স্প্যানিশদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কেউ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সুবিধা চেয়েছেন, কেউ বিপদ এড়াতে চেষ্টা করেছেন। তাঁদের সিদ্ধান্তকে সরলভাবে বিদেশিদের প্রতি আনুগত্য বলা যায় না।
১৫৩২ সালে স্প্যানিশরা সান মিগেল প্রতিষ্ঠা করে, বর্তমান পেরুতে তাদের প্রথম স্থায়ী বসতির ভিত্তি হিসেবে। এটি নিরাপদ পশ্চাৎঘাঁটি, উপকূলের যোগাযোগকেন্দ্র এবং নতুন জনবল গ্রহণের স্থান হয়ে ওঠে। সেখানে কিছু লোক রেখে পিজারো অভ্যন্তরের দিকে যাত্রা করেন। এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ পাহাড়ে প্রবেশের পর সমুদ্রপথের জাহাজ সরাসরি তাঁকে সাহায্য করতে পারত না। অভিযানকে টিকিয়ে রাখতে উপকূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্থানীয় সরবরাহ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।
কাজামার্কার পথে তাঁর বাহিনীর প্রচলিত হিসাব ১৬৮ জন—১০৬ পদাতিক ও ৬২ অশ্বারোহী। সংখ্যাটি বিস্ময়কর, কিন্তু তাদের শক্তি বুঝতে অস্ত্র ও পরিস্থিতি একসঙ্গে দেখতে হয়। ইস্পাতের তলোয়ার, বর্ম এবং ঘোড়া কিছু সংঘর্ষে সুবিধা দিত। আগ্নেয়াস্ত্র ছিল অল্প, ধীর এবং সীমাবদ্ধ। ইনকারাও যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিপক্ষ; তাদের গুলতি, বর্শা ও বৃহৎ বাহিনী বিপজ্জনক ছিল। বিশেষত পাহাড়ি সংকীর্ণ পথে স্প্যানিশদের অশ্বারোহী সুবিধা কমে যেত।
তাই পিজারোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে ওঠে তথ্য, যোগাযোগ এবং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থার সুযোগ নেওয়া। আতাহুয়ালপার অবস্থান, গৃহযুদ্ধের ফল এবং স্থানীয় নেতাদের মনোভাব সম্পর্কে তিনি ধীরে ধীরে জানতে পারেন। দোভাষী ছাড়া আলোচনা সম্ভব ছিল না; স্থানীয় পথপ্রদর্শক ও মালবাহক ছাড়া অগ্রযাত্রাও অনেক কঠিন হতো। পরবর্তী বিজয়ে আরও স্প্যানিশ এবং বহু আদিবাসী সহযোগী যুক্ত হন। ফলে কয়েকশ ইউরোপীয় একাই সম্পূর্ণ সাম্রাজ্য জয় করেছিলেন—এই ধারণা ইতিহাসকে অসম্পূর্ণ করে।
১৫৩২ সালের ১৫ নভেম্বর পিজারোর ছোট দল কাজামার্কায় পৌঁছায়। কাছেই ছিলেন আতাহুয়ালপা, তাঁর বিপুল শক্তির ভিত্তি সদ্য অর্জিত গৃহযুদ্ধের বিজয়। স্প্যানিশরা তখনো কোনো সাম্রাজ্য জয় করেনি; তারা নিজেদের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী শাসকের উপস্থিতিতে একটি বিপজ্জনক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছিল। পরবর্তী পদক্ষেপে তারা সম্রাটকেই নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ খুঁজবে। পরদিনের সাক্ষাৎ তাই সাধারণ কূটনৈতিক বৈঠক হয়ে থাকেনি—কাজামার্কার প্রাঙ্গণে অপেক্ষা করছিল বন্দিত্ব, হত্যাকাণ্ড এবং ইনকা ইতিহাসের এক নির্ধারক মোড়।
পিকিং কনভেনশন ও আফিম যুদ্ধের উত্তরাধিকার: আধুনিক চীন কীভাবে বদলে গেল?
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান
কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ