ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থান ও সমৃদ্ধি: কুসকো থেকে আন্দিজজুড়ে বিস্তার
সিরিজ: ইনকা সাম্রাজ্যের পতন
কুসকোকে কেন্দ্র করে আন্দিজজুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল ইনকাদের সাম্রাজ্য।
আন্দিজের খাড়া পাহাড়, শীতল মালভূমি ও শুষ্ক উপকূলের মধ্যে এমন একটি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, যার দূরবর্তী প্রদেশে পৌঁছাতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাঁটতে হতো। কোথাও চাষের জমি পাহাড় কেটে বানাতে হয়েছে, কোথাও নদী পার হতে ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে। এই প্রতিকূল ভূগোলের মধ্যেই কুসকোকে কেন্দ্র করে ইনকারা গড়ে তোলে কলম্বাসের আগের আমেরিকার বৃহত্তম সাম্রাজ্য। তাদের সমৃদ্ধির ভিত্তি ছিল জমি, শ্রম, খাদ্যভান্ডার এবং বিচিত্র জনগোষ্ঠীকে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার ক্ষমতা। তবে যে বিস্তার তাদের শক্তিশালী করেছিল, তার মধ্যেই ভবিষ্যতের সংকটের বীজও রয়ে গিয়েছিল।
ইনকাদের উত্থান বোঝার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: আন্দিজে সভ্যতার সূচনা তাদের হাতে হয়নি। তাদের বহু আগে মোচে, নাসকা, ওয়ারি, তিওয়ানাকু ও চিমু সমাজ কৃষি, নগরায়ণ, সেচ এবং কারুশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছিল। ইনকারা এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকারী। তারা আগের জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে নতুন মাত্রায় সংগঠিত করেছিল। ইনকা সাম্রাজ্যের অসাধারণত্ব ছিল বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক সম্পদ ও দক্ষতাকে সাম্রাজ্যিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
ইনকাদের উৎপত্তির কাহিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একটি প্রচলিত কাহিনিতে মানকো কাপাক ও মামা ওক্লো সূর্যদেবতার নির্দেশে মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে আসেন। অন্য বর্ণনায় আয়ার ভাইবোনদের অভিবাসনের কথা পাওয়া যায়। এগুলোকে সরাসরি ঘটনাক্রম ধরে ইতিহাস লেখা যায় না। প্রত্নতাত্ত্বিক ও পরবর্তী লিখিত বিবরণ মিলিয়ে বোঝা যায়, আনুমানিক ত্রয়োদশ শতক নাগাদ কুসকো উপত্যকায় ইনকা শক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। প্রথমদিকে তারা প্রতিবেশী বহু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে একটি ছিল।
কুসকোর অবস্থান তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করেছিল। উপত্যকায় কৃষিকাজের সুযোগ ছিল, আবার আশপাশের উঁচু ও নিচু অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগও রাখা যেত। কিন্তু অনুকূল অবস্থান নিজে থেকে সাম্রাজ্য তৈরি করেনি। স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে বিবাহসম্পর্ক, জোট, সংঘর্ষ এবং জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইনকা অভিজাতেরা ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়ায়। তাদের রাজবংশীয় ইতিহাস প্রধানত স্প্যানিশ বিজয়ের পর লিপিবদ্ধ হয়েছিল। ফলে প্রাচীন শাসকদের কৃতিত্ব এবং নির্দিষ্ট সাল নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সাম্রাজ্যিক বিস্তারের প্রধান মোড় আসে পাচাকুতি ইনকা ইউপানকির সময়। প্রচলিত কালপঞ্জিতে ১৪৩৮ সালের কাছাকাছি চাঙ্কাদের আক্রমণ প্রতিহত করার সঙ্গে তাঁর উত্থান যুক্ত করা হয়। পরবর্তী বর্ণনায় এই বিজয়কে কুসকোর অস্তিত্ব রক্ষার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিস্তারিত কাহিনিতে মতভেদ থাকলেও পাচাকুতির শাসনে ইনকা রাষ্ট্রের বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল। কুসকোর আঞ্চলিক আধিপত্যকে তিনি বিস্তৃত সাম্রাজ্যে রূপান্তরের পথে নিয়ে যান; সামরিক অভিযান, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং রাজধানীর পুনর্নির্মাণ একসঙ্গে এগোয়।
ইনকাদের সাম্রাজ্যের নাম ছিল তাওয়ান্তিনসুয়ু, অর্থাৎ মোটামুটি “চার অঞ্চলের সমন্বিত রাজ্য”। কুসকোকে কেন্দ্র করে এর চার প্রধান বিভাগ ছিল চিনচায়সুয়ু, আন্তিসুয়ু, কুন্তিসুয়ু ও কোল্লাসুয়ু। এই বিন্যাস রাজধানীকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সর্বোচ্চ শাসক, যাঁকে সাধারণত সাপা ইনকা বলা হয়, ছিলেন এই ব্যবস্থার শীর্ষে। তাঁর অধীনে অভিজাত কর্মকর্তা এবং স্থানীয় নেতা বা কুরাকা কাজ করতেন। ফলে কেন্দ্রের আদেশ বাস্তবায়নে পুরোনো স্থানীয় নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ থেকে যায়।
পাচাকুতির পর তুপাক ইনকা ইউপানকি এবং পরে হুয়াইনা কাপাক সাম্রাজ্যের বিস্তার ও সংহতি এগিয়ে নেন। উপকূলের শক্তিশালী চিমু রাজ্যও ইনকাদের অধীন হয়। ষোড়শ শতকের শুরুতে সাম্রাজ্য বর্তমান পেরু ও বলিভিয়ার বিস্তীর্ণ অংশের পাশাপাশি ইকুয়েডর, দক্ষিণ কলম্বিয়া, উত্তর চিলি এবং উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনার বিভিন্ন অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। তবে আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর সম্পূর্ণ ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। দুর্গম সীমান্তে প্রভাব অসম ছিল, আর অনেক এলাকায় কর্তৃত্ব ধরে রাখতে বারবার অভিযান চালাতে হতো।
এই বিস্তার কেবল যুদ্ধের ফল ছিল না। কোনো অঞ্চলের শাসক আনুগত্য মেনে নিলে তাঁকে পদে বহাল রাখা, উপহার দেওয়া এবং ইনকা অভিজাতদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার সুযোগ দেওয়া হতো। বিনিময়ে দরকার ছিল শ্রম, সৈন্য এবং রাজনৈতিক আনুগত্য। প্রতিরোধ হলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হতো। সমঝোতা ও বলপ্রয়োগ ছিল একই সম্প্রসারণনীতির দুই অংশ। বিজিত মানুষের কাছে সাম্রাজ্য কখনো নিরাপত্তা ও সম্পদের সুযোগ এনেছে, আবার কখনো জমি, স্বাধীনতা এবং পরিচিত সামাজিক সম্পর্ক হারানোর কারণ হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার একটি উপায় ছিল পরিকল্পিত জনস্থানান্তর। মিতমাককুনা নামে পরিচিত জনগোষ্ঠীগুলোকে অন্য অঞ্চলে বসতি স্থাপন করানো হতো। বিশ্বস্ত মানুষকে অশান্ত প্রদেশে পাঠানো, বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করা এবং বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকদের প্রয়োজনমতো সরানো—বিভিন্ন উদ্দেশ্য এতে কাজ করত। প্রশাসনের ভাষা হিসেবে কেচুয়ার প্রসারও যোগাযোগ সহজ করে। কিন্তু সাম্রাজ্যের মানুষ এক ভাষা বা এক সংস্কৃতির ছিল না; স্থানীয় ভাষা, দেবতা ও সামাজিক পরিচয় বহু ক্ষেত্রেই টিকে ছিল।
এই বহুজাতিক রাষ্ট্রকে সচল রাখত কাপাক ন্যান সড়কব্যবস্থা। পূর্ববর্তী পথ সংস্কার এবং নতুন সংযোগ নির্মাণ করে ইনকারা কয়েক দশক হাজার কিলোমিটারজুড়ে যোগাযোগের জাল বিস্তার করেছিল। পাহাড়ে সিঁড়ি, জলনিকাশের ব্যবস্থা এবং নদীর ওপর তৃণতন্তুর সেতু পথকে ব্যবহারযোগ্য রাখত। নির্দিষ্ট ব্যবধানে থাকা তাম্বো কেন্দ্রগুলো যাত্রা ও সরবরাহে সহায়তা করত। এই পথে সৈন্য, কর্মকর্তা এবং লামার কাফেলা চলত। সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ তাই কেন্দ্রীয় ক্ষমতার একটি দৈনন্দিন প্রয়োজন ছিল।
দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দিতেন চাসকি বার্তাবাহকেরা। তাঁরা নির্দিষ্ট পথাংশ দৌড়ে পরবর্তী বাহকের কাছে সংবাদ বা ছোট সামগ্রী হস্তান্তর করতেন। পাশাপাশি প্রশাসনের হিসাব সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতো কিপু—রঙিন দড়ি ও গিঁটের তথ্যব্যবস্থা। প্রশিক্ষিত কিপুকামায়োকেরা জনসংখ্যা, মজুত এবং শ্রমের হিসাব রাখতেন। কিপুর সংখ্যাভিত্তিক ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হলেও এর সব ধরনের তথ্য পুরোপুরি পাঠোদ্ধার হয়নি। তাই ইনকাদের বর্ণমালাভিত্তিক লিখনপদ্ধতি না থাকার অর্থ প্রশাসনিক নথি না থাকা নয়।
অর্থনীতির মৌলিক সামাজিক একক ছিল আইয়ু, অর্থাৎ আত্মীয়তা, জমি ও পারস্পরিক দায়িত্বে যুক্ত সম্প্রদায়। মানুষ পরিবারের জমি চাষের পাশাপাশি সমষ্টিগত কাজে অংশ নিত। রাষ্ট্র এই শ্রমসম্পর্ককে বৃহত্তর ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করে। মিতা ব্যবস্থায় পালাক্রমে শ্রম দেওয়া ছিল প্রধান বাধ্যবাধকতা। রাস্তা নির্মাণ, রাষ্ট্রীয় জমি চাষ, খনি, পরিবহন ও সামরিক কাজে শ্রম লাগত। এর বিনিময়ে রাষ্ট্র খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা দিত, যদিও এই বিনিময় সমান ক্ষমতাসম্পন্ন পক্ষগুলোর মধ্যে ঘটত না।
কৃষিতে ইনকাদের সাফল্যের বড় কারণ ছিল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। পাহাড়ের ঢালে আন্দেনেস বা ধাপচাষের জমি মাটিক্ষয় কমাত এবং জল ব্যবস্থাপনা সহজ করত। নিচু উপত্যকায় ভুট্টা, উঁচু অঞ্চলে আলু ও কিনোয়া উৎপাদিত হতো। আলু জমিয়ে ও শুকিয়ে চুনিয়ো তৈরি করা যেত, যা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য। লামা মাল বহন করত এবং আলপাকা মূল্যবান তন্তু দিত। বিভিন্ন উচ্চতার উৎপাদন একত্র হওয়ায় কোনো একটি পরিবেশের ওপর নির্ভরতা কমত।
উৎপাদিত সম্পদের একটি অংশ রাখা হতো কোল্লকা নামের রাষ্ট্রীয় গুদামে। শস্য, শুকনো খাদ্য, পোশাক ও সরঞ্জামের মজুত সৈন্যবাহিনী এবং শ্রমিকদলকে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ দিত। দুর্ভিক্ষ বা স্থানীয় সংকটেও এসব মজুত ব্যবহারের ব্যবস্থা ছিল। তবে ইনকা অর্থনীতিকে বাজারহীন এক নিখুঁত কল্যাণরাষ্ট্র বলা বিভ্রান্তিকর। স্থানীয় বিনিময় ও কিছু অঞ্চলে বাণিজ্য চলত; পাশাপাশি রাষ্ট্র শ্রম ও উদ্বৃত্তের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। সমৃদ্ধির সুবিধা অভিজাত এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়নি।
কুসকোর কোরিকানচা মন্দির, রাজপ্রাসাদ এবং নিখুঁতভাবে জোড়া পাথরের দেয়াল সেই সম্পদ ও দক্ষতার দৃশ্যমান প্রকাশ ছিল। সূর্যদেবতা ইন্তির সঙ্গে রাজবংশের সম্পর্ক শাসনকে পবিত্র মর্যাদা দিত। রাজকীয় আচার, পূর্বপুরুষের মমি এবং সূক্ষ্ম বস্ত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অংশ হয়ে ওঠে। ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে শাসক ও অধীন জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক গড়ে তোলা হতো, যদিও স্থানীয় উপাসনাও অনেক ক্ষেত্রে চলতে পারত। রাজধানীর জাঁকজমকের পেছনে ছিল দূরবর্তী গ্রামগুলোর খাদ্য, শ্রম এবং কারিগরি দক্ষতা।
ষোড়শ শতকের শুরুতে এই ব্যবস্থাই ইনকাদের অভূতপূর্ব শক্তির উৎস ছিল। কিন্তু বিশাল সাম্রাজ্য ধরে রাখতে দরকার ছিল শাসকের মর্যাদা, অভিজাতদের সহযোগিতা এবং প্রদেশগুলোর আনুগত্য। উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ বাধলে সেই সংযোগগুলোই দুর্বল হয়ে পড়তে পারত। হুয়াইনা কাপাকের শাসনে সাম্রাজ্য বিস্তৃত হচ্ছিল, অথচ রাজপরিবারে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান ছিল না। তাঁর মৃত্যু, মহামারির অভিঘাত এবং দুই রাজপুত্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শিগগিরই কুসকোকেন্দ্রিক এই শক্তিশালী ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেবে।
পিকিং কনভেনশন ও আফিম যুদ্ধের উত্তরাধিকার: আধুনিক চীন কীভাবে বদলে গেল?
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান
কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ