ডিগ্রি আছে, চাকরি কোথায়? বাংলাদেশ ও ভারতের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট
সনদ থেকে কর্মসংস্থান—তরুণদের সামনে দক্ষতা, সুযোগ ও অপেক্ষার দেয়াল।
সনদ বাড়ছে, কিন্তু উপযুক্ত কাজের দরজা কতটা খুলছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষা দেওয়ার পর যে তরুণ ভেবেছিলেন এবার পরিবারের দায়িত্ব নেবেন, কয়েক বছর পরও তাঁকে আবেদনপত্রের টাকা চাইতে হচ্ছে। কেউ সাক্ষাৎকারে শুনছেন অভিজ্ঞতা নেই, কেউ নিজের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজ করছেন, আবার কেউ সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের ভেতরে এই ভিন্ন বাস্তবতাগুলো একসঙ্গে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৩ সালে তরুণদের বেকারত্ব ছিল ৮ শতাংশ; বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন এমন তরুণদের ক্ষেত্রে তা ছিল ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেই কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তা দূর হচ্ছে না।
ভারতের ক্ষেত্রেও চিত্রটি উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও মানব উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালে স্নাতক তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ২৯ দশমিক ১ শতাংশ। ওই প্রতিবেদনে তরুণ বলতে ১৫–২৯ বছর বয়সীদের বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশের উল্লিখিত তথ্যের সঙ্গে বছর ও শিক্ষাগত শ্রেণিবিভাগের পার্থক্য থাকায় সংখ্যাগুলো দিয়ে সরাসরি দেশভিত্তিক অবস্থান নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।
বেকারত্বের হার পুরো সংকট দেখায় না
যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচের পদে কাজ করা, অনিয়মিত আয় কিংবা অনিচ্ছায় অল্প সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা বেকারত্বের হিসাবে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। আবার কাজ খোঁজা ছেড়ে দেওয়া মানুষও সাধারণত বেকারের সংজ্ঞায় থাকেন না। ফলে শুধু একটি হার কমলেই শিক্ষিত তরুণদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলা যায় না।
পড়াশোনা ও কাজের দক্ষতার মধ্যে ফাঁক কোথায়?
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারেন, অথচ প্রতিষ্ঠানের বিক্রির হিসাব বিশ্লেষণ, সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন লেখা কিংবা অসন্তুষ্ট ক্রেতার সমস্যা সমাধানে অপ্রস্তুত থাকতে পারেন। কারণ বিষয় সম্পর্কে জানা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করা আলাদা সক্ষমতা।
সমস্যা বিশেষত সেখানে বাড়ে, যেখানে মূল্যায়ন মুখস্থনির্ভর, ব্যবহারিক কাজ সীমিত এবং পাঠ্যক্রম হালনাগাদে নিয়োগদাতাদের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট বিবেচিত হয় না। শিক্ষার্থী তখন সনদ পান, কিন্তু নিজের কাজের নমুনা দেখানোর সুযোগ পান না।
দক্ষতার ঘাটতি আছে, কাজের ঘাটতিও আছে
তবে সংকটের পুরো দায় শিক্ষার্থীর ওপর চাপানো ভুল। সবাই ভালো যোগাযোগ, হিসাব বিশ্লেষণ বা যন্ত্র পরিচালনা শিখলেও উপযুক্ত পদ সমান হারে তৈরি না হলে প্রতিযোগিতা থেকেই যাবে। প্রশিক্ষণ চাকরিপ্রার্থীর সক্ষমতা বাড়ায়; বিনিয়োগ ও প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ কাজের সুযোগ বাড়ায়।
বাংলাদেশে উৎপাদনশীল শিল্প ও সেবার বিস্তার এবং ভারতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত প্রারম্ভিক পদ সৃষ্টি—দুটিই তাই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত করাও সমাধান নয়। বিশ্লেষণ, ভাষা, গবেষণা ও সামাজিক উপলব্ধির ভিত্তির সঙ্গে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে হবে।
অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি নয়: প্রথম সুযোগটি দেবে কে?
নতুন স্নাতকের কাছে পূর্ব অভিজ্ঞতা চাওয়ার পেছনে প্রতিষ্ঠানের একটি হিসাব থাকে। কর্মীকে শেখাতে সময় ও অর্থ লাগে; ভুল হলে ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে। তাই অনেক নিয়োগদাতা এমন কাউকে চান, যিনি যোগদানের পরপরই কাজ করতে পারবেন।
কিন্তু সব প্রতিষ্ঠান একই আচরণ করলে নতুনদের জন্য প্রবেশপথ সংকুচিত হয়। শিক্ষার্থী কাজ না পেয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন না, আর অভিজ্ঞতা না থাকায় কাজ পান না। সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তান পরিচিতজনের মাধ্যমে সুযোগ কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে কাজের অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। দরিদ্র পরিবারের তরুণের পক্ষে কয়েক মাস আয়হীন থাকা কঠিন।
জার্মানির দ্বৈত কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা এখানে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা দেয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কাজ শেখা ও বিদ্যালয়ের পাঠ সমন্বিত হয়; প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু এবং যোগ্যতা মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত ভূমিকা থাকে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলোর গড়ে ২০২৫ সালে কারিগরি উচ্চমাধ্যমিক বা সমপর্যায়ের যোগ্যতাসম্পন্ন ২৫–৩৪ বছর বয়সীদের কর্মসংস্থানের হার ছিল প্রায় ৮৩ শতাংশ; সাধারণ ধারার সমপর্যায়ের শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৩ শতাংশ। এটি কারিগরি শিক্ষার একক কার্যকারণ প্রমাণ করে না, তবে কাজের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগের গুরুত্ব বোঝায়।
বাংলাদেশ ও ভারতে সেই শিক্ষা কাজে লাগাতে হলে পারিশ্রমিকসহ শিক্ষানবিশি, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণপরিকল্পনা এবং অর্জিত দক্ষতার স্বীকৃতি প্রয়োজন। শুধু উপস্থিতির সনদ দেওয়া যথেষ্ট নয়।
সরকারি চাকরির আকর্ষণ এবং পরিবারের অদৃশ্য ব্যয়
সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণকে কেবল সামাজিক মর্যাদার মোহ বলা অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা। নিয়মিত বেতন, তুলনামূলক স্থিতিশীলতা, নির্ধারিত ছুটি এবং বিধিবদ্ধ সুবিধা অনেক পরিবারের কাছে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতীক। বিপরীতে বেসরকারি চাকরিতে অনিশ্চিত নিয়োগ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বা দুর্বল সুরক্ষা থাকলে সরকারি চাকরির অপেক্ষা যৌক্তিক মনে হতে পারে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন সীমিত পদের প্রস্তুতি দীর্ঘমেয়াদি একমাত্র পরিকল্পনায় পরিণত হয়। তখন পরীক্ষায় সাফল্য অনিশ্চিত থাকলেও বিকল্প কর্মজীবনের প্রস্তুতি পিছিয়ে যায়। নিয়োগে বিলম্ব সেই অনিশ্চয়তা আরও বাড়ায়।
খরচ শুধু প্রস্তুতির বই ও আবেদনমূল্য নয়
ধরা যাক, একজন প্রার্থীর প্রস্তুতির জন্য থাকা, খাওয়া, যাতায়াত ও পড়াশোনায় মাসে অতিরিক্ত আট হাজার টাকা লাগে। দুই বছরে পরিবারের সরাসরি ব্যয় হয় এক লাখ বিরানব্বই হাজার টাকা। এটি ব্যয় বোঝানোর কাল্পনিক হিসাব, কোনো জরিপের গড় নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সম্ভাব্য আয় হারানোর খরচ, সঞ্চয় কমে যাওয়া এবং ছোট ভাইবোনের শিক্ষায় চাপ। নিম্ন আয়ের পরিবারে এই অপেক্ষা কখনো ঋণ বা সম্পদ বিক্রির প্রয়োজনও তৈরি করতে পারে। তাই প্রস্তুতির সময়সীমা নির্ধারণ, পাশাপাশি কাজ শেখা এবং নিয়মিত বিকল্প পথ পর্যালোচনা করা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
কর্মসংস্থান ছাড়া প্রবৃদ্ধি কেন সবার জীবনে পৌঁছায় না?
অর্থনীতির উৎপাদন বাড়লে সবার আয় একইভাবে বাড়ে না। প্রবৃদ্ধি যদি সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত হয় কিংবা তুলনামূলক কম কর্মী প্রয়োজন এমন খাতে বেশি ঘটে, তাহলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি নাও হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও সমতাবিষয়ক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের পর প্রবৃদ্ধি কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে এবং আয়বৈষম্য বেড়েছে। উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্থবিরতা ও কম উৎপাদনশীল কাজে সরে যাওয়ার প্রবণতা তরুণ ও নারীদের বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অর্থ হলো এমন অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ, যার সুযোগ রাজধানীর প্রতিষ্ঠিত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জেলার শিক্ষার্থী, দরিদ্র পরিবারের স্নাতক এবং পরিবারের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া সদস্যও যাতে দক্ষতা অনুযায়ী কাজ পেতে পারেন।
নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত, হয়রানি প্রতিরোধ এবং সন্তান পরিচর্যার ব্যবস্থা এই আলোচনার অংশ। চাকরির বিজ্ঞাপন থাকলেও কর্মস্থলে পৌঁছানো বা সেখানে টিকে থাকা অসম্ভব হলে সুযোগটি বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য হয় না।
সনদ থেকে কর্মজীবনে যাওয়ার পথ কীভাবে সহজ হবে?
প্রথম পরিবর্তন দরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতে। শুধু কতজন উত্তীর্ণ হলেন তা নয়, কে কী ধরনের কাজে গেলেন, কত সময় লাগল এবং পড়াশোনার কোন অংশ কাজে লেগেছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করতে হবে। সেই ফলের ভিত্তিতে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার্থী সহায়তা সংশোধন করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রারম্ভিক পদে অযৌক্তিক অভিজ্ঞতার শর্ত কমিয়ে কাজের নমুনা ও সক্ষমতাভিত্তিক মূল্যায়ন বাড়াতে হবে। শিক্ষানবিশ নিয়োগে সহায়তা দিলে তার সঙ্গে প্রশিক্ষণের মান ও পরবর্তী কর্মসংস্থানের ফল যাচাইও যুক্ত থাকা উচিত।
তৃতীয়ত, সরকারি নিয়োগের পূর্বানুমানযোগ্য সময়সূচি এবং বেসরকারি চাকরিতে নিয়মিত বেতন ও ন্যায্য কর্মপরিবেশ জরুরি। ভালো বিকল্প তৈরি হলে একটি পরীক্ষার ওপর পুরো ভবিষ্যৎ নির্ভর করার চাপ কমে।
সবশেষে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, অর্থায়ন এবং স্বচ্ছ ব্যবসায়িক নিয়ম প্রয়োজন। তরুণকে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি তাঁর দক্ষতা ব্যবহার করার মতো কর্মস্থলও তৈরি করতে হবে। শিক্ষায় পরিবারের বিনিয়োগ তখনই সার্থক হয়, যখন সনদটি আয়, মর্যাদা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তব সুযোগে পরিণত হয়।
রুয়ান্ডার ১০০ দিনের গণহত্যা: তুতসি ও মধ্যপন্থী হুতুদের ওপর হত্যাযজ্ঞ
রুয়ান্ডায় গণহত্যার সূচনা: বিমান হামলা ও ৭ এপ্রিলের হত্যাযজ্ঞ
রুয়ান্ডার গণহত্যার পটভূমি: ঔপনিবেশিক বিভাজন থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধ
মহাভীতি ও সামন্ততন্ত্রের অবসান: মানবাধিকার ঘোষণা থেকে নারীদের ভার্সাই মিছিল
বাস্তিল দুর্গের পতন: ১৪ জুলাই ১৭৮৯ কীভাবে ফরাসি বিপ্লব বদলে দিল
এস্টেটস জেনারেল ও টেনিস কোর্ট শপথ: ১৭৮৯ সালে রাজক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ