বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ২২ : শেষ সাক্ষাৎ

পৃষ্ঠা 22 / 25

সকালে তারা আবার স্টেশনে গেল।

এইবার কারও হাতে খাম নেই।
কোনো নতুন ঠিকানাও নেই।
শুধু নীরবতা, আর তার ভেতরে জমে থাকা অপেক্ষা।

চন্দনপুর স্টেশনের পিছনের পুরোনো ঘরটা তখনও একই রকম ছিল—জানালা ভাঙা, দরজা একটু বেঁকে আছে, আর ভেতরে দিনের আলোও যেন ঢুকতে চায় না।
দেয়ালের রঙ উঠে গেছে।
কাঠের টেবিলটার ওপর ধুলোর পাতলা আস্তরণ।
এক পাশে একটা পুরোনো খাতা।

সোহান খাতাটা হাতে নিল।
মলাট শক্ত, কিন্তু ভিতরের কাগজ নরম হয়ে গেছে।
প্রথম পাতায় কোনো নাম নয়—শুধু তারিখ, হাসপাতালের নম্বর, আর কয়েকটা সংক্ষিপ্ত নোট।

মেহরিন কাগজের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
“এখানে রোগীর কথা লেখা আছে।”

অর্ণব চুপ করে রইল।

সাহায্যকারীর হাতের লেখা খুব পরিষ্কার না, কিন্তু বোঝা যায়।
একজন অচেনা পুরুষ আনা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর।
কিছু সময় ধরে নিজেকে চিনতে পারছিল না।
প্রশ্ন করলে খুব কম উত্তর দিত।
মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে থাকত, যেন ভেতরে কোথাও একটা জিনিস খুঁজছে।

সোহান পরের পাতায় উল্টাল।

সেখানে লেখা ছিল, রোগীকে কিছুদিন পরে অন্য নামে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
পরবর্তী নথি সংরক্ষিত।

মেহরিন থেমে গেল।
“মানে...”

সোহান আস্তে বলল, “মানে... এরপর আর আগের পরিচয়ের কোনো উল্লেখ নেই।”

কেউ আর কিছু বলল না।

পাতাগুলো এগোতে এগোতে তিনজনের সামনে ধীরে ধীরে একটা জীবন খুলে যেতে লাগল—অসম্পূর্ণ, থেমে যাওয়া, আর কারও অগোচরে আবার গড়ে ওঠা।

সেই জীবনটায় নাম ছিল না শুরুতে।
শুধু ক্ষত, ওষুধ, আর নীরবতা।

অর্ণব হঠাৎ এক জায়গায় থেমে গেল।

“এখানে একজন এসেছে।”

সোহান পাশে এসে দাঁড়াল।

পাতার মাঝখানে লেখা ছিল, খুব সাধারণভাবে—

“আজ একজন মানুষ এল।”

এর নিচে আরেক লাইন।

“অনেকক্ষণ বসে রইল।”

মেহরিন চুপ করে পড়ল, তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “কেউ চিনতে পেরেছিল?”

কেউ উত্তর দিল না।

পরের পাতায় লেখা ছিল, রোগী প্রথমে ভদ্রভাবে কথা বলেছে, কিন্তু চোখে সন্দেহ ছিল।
আরও পরে—খুব ধীরে—সে চুপ হয়ে যায়।
তারপর একটা দীর্ঘ নীরবতা।

সেই পাতার নিচে, কৌণিকভাবে লেখা একটি নাম ছিল।

ধীরে, খুব ধীরে, পাতার একেবারে নিচে—

আব্দুল কাদের

মেহরিন নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।

অর্ণবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
এক মুহূর্তে ঘরটাকে যেন অন্য রকম লাগল।

খাতায় কোথাও কাদের কী বলেছিল তা নেই।
শুধু বোঝা যায়, তার আসাটা সাধারণ ছিল না।
রোগী সেদিন অনেকক্ষণ চুপ ছিল।
পরে কেঁদেছিল।

সোহান থমকে গেল।
“কেঁদেছিল?”

খাতার নিচে শুধু এইটুকুই লেখা—

“আজ কথা কম।
চোখে জল বেশি।”

মেহরিন হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।
অর্ণব জানালার দিকে তাকাল, যেন ভেতরের ভাঙন লুকোতে চাইছে।

সোহান পরের পাতায় চোখ রাখল।
সেখানে আর বড় কোনো ব্যাখ্যা নেই।
শুধু কয়েকটা ছোট নোট।

“কথা বলতে অনিচ্ছুক।”
“পরিচয় সম্পর্কে নীরব।”
“শেষের দিকে আর কথা বলতে চায়নি।”

এই লাইনগুলো পড়ে কেউ কোনো মন্তব্য করল না।
কারণ মন্তব্য করার মতো শক্তি তখন কারও ছিল না।

খাতার শেষ অংশে পৌঁছে তারা থেমে গেল।
সেখানে আর একবার কাদেরের নাম নেই।
শুধু তারিখ।
শুধু পরের দিনের নোট।
শুধু রোগীর নীরবতা।

সোহান খাতা বন্ধ করল।

বাইরে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তখন রোদ পড়েছে।
দূরে একটা ট্রেন এসে থামল।
আবার ছেড়ে দিল।
যাত্রীরা নেমে গেল।
কেউ উঠল।
জীবন চলল।

কিন্তু এই ঘরের ভেতর ফিরে এল শুধু একটি নাম।
মানুষটা নয়।

অর্ণব অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
শেষে খুব আস্তে বলল, “এত বছর পরে... সে এসেছিল।”

মেহরিন তাকাল তার দিকে।
তার চোখে জল ছিল।

“হ্যাঁ,” সে বলল।
“এসেছিল।”

সোহান খাতাটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।

খাতার শেষ পাতার কোণায় ছোট করে লেখা ছিল—

আব্দুল কাদের

সোহান দেখল।
মেহরিনও।
অর্ণবও।

তারপর আর কেউ খাতায় হাত দিল না।

সোহানের মনে হলো, এই খাতা ইচ্ছে করেই সব কথা বলেনি।
হয়তো শেষ সত্যটা এখনো অন্য কোথাও অপেক্ষা করছে।