বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ২১ : সত্যের কাছাকাছি

পৃষ্ঠা 21 / 25

সুবর্ণার রেখে যাওয়া খামটা তারা খুলল, বৃদ্ধার বাড়ি থেকে বের হয়ে নয়।
খুলল বাড়ি ফিরে, দরজা বন্ধ করে, টেবিলের ওপর।

খামটার ভেতরে ছিল তিনটে জিনিস।

একটা পুরোনো চিঠি।
একটা হাসপাতালের কাগজের টুকরো।
আর একটা ছোট নোট, মাত্র কয়েকটি শব্দে লেখা।

সোহান প্রথমে নোটটার দিকেই তাকাল।

“যে বেঁচে যায়, সে সবসময় ফিরে আসে না।”

কথাটা পড়ে তিনজনই চুপ করে গেল।

মেহরিন ধীরে চিঠিটা হাতে নিল।
কাগজটা হলদে, ভাঁজে ভাঁজে নরম হয়ে গেছে।
লেখা একটু কেঁপে কেঁপে উঠেছে, কিন্তু বোঝা যায়।

চিঠিটা কারও কাছে পাঠানো হয়নি।
এটা যেন কারও জন্য রেখে দেওয়া একটা স্মৃতি।

ভেতরে লেখা ছিল, একদিন বিকেলের পর সুবর্ণা খবর পেয়েছিলেন—দুর্ঘটনার পর একজন অচেনা মানুষকে হাসপাতালে আনা হয়েছে।
তার নাম তখন জানা ছিল না।
চেনা কেউও নয়।
শুধু একজন রোগী, যাকে কয়েক দিন ধরে চিনতে পারছিল না কেউ।

অর্ণব কাগজটার দিকে ঝুঁকে পড়ল।
“এখানে নাম নেই।”

সোহান মাথা নাড়ল।
“না।”

হাসপাতালের কাগজটায় তারিখ ছিল।
তারিখটা পুরোনো।
নীচে হাতের লেখা দু’চারটি শব্দ।
একজন অনিশ্চিত রোগী।
পরিচয় আপাতত নিশ্চিত নয়।

মেহরিন খুব আস্তে বলল, “তাহলে... কিছু একটা উনি জেনেছিলেন।”

কেউ উত্তর দিল না।

চিঠির ভেতর আরেক জায়গায় লেখা ছিল, লোকটা কয়েকদিন পর কথা বলতে শুরু করে।
কিন্তু সব কথা একসঙ্গে নয়।
কখনো মনে পড়ে।
কখনো মনে পড়ে না।
তারপর একদিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
নামও বদলে যায়।

অর্ণব কপাল কুঁচকে বলল, “নাম বদলায়?”

সোহান চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “তারপর আর আগের নামটা কোথাও নেই।”

মেহরিন চিঠির শেষ দিকে চোখ বুলিয়ে থেমে গেল।
একটা লাইন বেশ পরিষ্কার ছিল।

“আমি তাকে দেখেছিলাম।”

তার ঠিক নিচে, ছোট অক্ষরে আরও একটি বাক্য লেখা ছিল—
“যদি কখনো সত্য খুঁজতে চাও, স্টেশনের পিছনের পুরোনো ঘরটায় একবার যেও।”

কথাটা পড়ে ঘরের ভেতর হঠাৎ আরও নীরবতা নেমে এলো।

চিঠিতে কোথাও স্পষ্ট করে লেখা ছিল না কার কথা বলা হচ্ছে।
তবু তিনজনেরই বুঝতে অসুবিধা হলো না, সেই দেখাটা স্রেফ কাকতালীয় ছিল না।
সুবর্ণা কিছু জেনেছিলেন।
কিছু জেনেও কাউকে বলেননি।

সোহান হাসপাতালের কাগজটা তুলে নিল।
তার ভাঁজের নিচে আরও একটা ছোট লাইন ছিল, প্রায় চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতো।

“কেউ তাকে নিয়ে গিয়েছিল।”

অর্ণব ধীরে নিশ্বাস ফেলল।
“এটাই যথেষ্ট।”

মেহরিন তাকাল।
“কিসের জন্য?”

“বুঝতে,” অর্ণব বলল।
“কেউ যদি আর ফিরে না আসে, তার মানে এই নয় যে সব শেষ হয়ে গেছে। ”

কথাটা কেউ চ্যালেঞ্জ করল না।

সোহান আবার নোটটার দিকে তাকাল। মনে হলো, এই একটা ছোট বাক্যের মধ্যে সুবর্ণার পুরো জীবনের ভার লুকিয়ে আছে। তিনি কিছু দেখেছিলেন। তারপর সারা জীবন সেটাই ধরে রেখেছিলেন। একটা প্রতীক্ষা, যা উত্তর জানত, কিন্তু উচ্চারণ করত না। তিনি কাউকে বিশ্বাস করাতে চাননি। শুধু নিজে বিশ্বাস করে গিয়েছিলেন। 

মেহরিন খুব আস্তে বলল, “তিনি শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাই করেছেন।”

সোহান মাথা নাড়ল।
এইবার তিনজনের মনেই একই প্রশ্ন জন্ম নিল। 

বাহিরে সন্ধ্যা নামছিল।
জানালার কাঁচে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছিল।
টেবিলের ওপর কাগজ তিনটে পড়ে ছিল, আর তাদের মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য দূরত্ব।

অর্ণব হঠাৎ বলল, “তাহলে রাশেদ…”

সে বাক্যটা শেষ করল না।

কিন্তু কেউ চাইলে বাকিটা শুনে নিতে পারত।

সোহান শুধু বলল, “এতটুকু এখন জানি।”

তারপর কাগজগুলো খুব ধীরে ভাঁজ করল।
একটা চিঠি।
একটা হাসপাতালের কাগজ।
একটা ছোট নোট।
সব মিলিয়ে তারা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারছিল—সত্য সামনে এসেছে ঠিকই, কিন্তু পুরোটা নয়।

মেহরিন কাগজগুলো আবার খামের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
“এখনো অনেক কিছু বাকি।”

সোহান খামটার ওপর হাত রাখল।
“হ্যাঁ।”

কেউ আর কিছু বলল না।

কারণ প্রথমবার তাদের মনে হলো, উত্তর পাওয়ার চেয়ে উত্তরকে বিশ্বাস করা আরও কঠিন।