চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ১২ : বর্তমানের ফাটল
রাশেদের ছবিটা টেবিলের ওপরই ছিল।
কাগজে দুইটি নাম—কাদের ও রাশেদ। তার পাশে জন্মসনদ, স্কুলের রসিদ, আর ডায়েরি। সবকিছু গুছিয়ে রাখা হলেও ঘরের ভেতরে একটা অগোছালো চাপ ছিল, যেটা কেউ স্পর্শ করলেই আরও ছড়িয়ে পড়ত।
সকালটা অনেকটা নীরবেই কাটছিল।
সোহান ডায়েরির পাতাগুলো আরেকবার দেখে নিচ্ছিল।
মেহরিন জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
অর্ণব টেবিলের ধারে হেলান দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তাতে মন ছিল না।
নিচ থেকে করিম চাচার গলা এলো।
“কেউ আসছে, বাবা।”
সোহান সিঁড়ির দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড পর নিচতলার দরজা খোলার শব্দ।
তারপর একজনের গলা—শান্ত, চাপা, খুব ভদ্র।
“অর্ণব সাহেব আছেন?”
করিম চাচা একটু থেমে বললেন, “কে?”
“ওনাকে একটু দরকার ছিল।”
অর্ণবের মুখের রং হঠাৎ বদলে গেল।
সে টেবিল ছেড়ে সরে দাঁড়াল, যেন নিজের শরীরটাকেও লুকিয়ে রাখতে চাইছে।
নিচ থেকে আবার গলা এলো, বেশি জোরে নয়, কিন্তু চাপা জেদ নিয়ে।
“আমরা আর কতদিন অপেক্ষা করব, অর্ণব সাহেব?”
অর্ণব খুব আস্তে বলল, “আর একটু সময় দিন।”
“সময় তো অনেক দিলাম।”
সেই কথা শুনেই অর্ণবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
সে কিছু বলল না।
সামনের লোকদের মুখও দেখা যাচ্ছিল না।
শুধু তাদের উপস্থিতিটা টের পাওয়া যাচ্ছিল।
সোহান ওপরে দাঁড়িয়ে সেই নীরবতা শুনছিল।
রাশেদের ছবিটা তখনও টেবিলের ওপর।
যেন ঘরের ভেতর অন্য এক সাক্ষী।
কিছুক্ষণ পরে লোকগুলো চলে গেল।
দরজার শব্দটা ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে।
কিন্তু গলার চাপটা থেকে গেল।
অর্ণব ওপরে উঠে এসে একপাশে বসে পড়ল।
তার মুখে কোনো রসিকতা নেই।
মেহরিন ধীরে জিজ্ঞেস করল, “কত বাকি?”
অর্ণব উত্তর দিল না।
সোহান ছবিটার দিকে তাকাল।
তারপর অর্ণবের দিকে।
“বাবা থাকলে কী করতেন?”
অর্ণব একবার হেসে ফেলতে গিয়েও থেমে গেল।
“বাবা থাকলে আমি এত দূর পৌঁছাতাম না।”
কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গেল।
রাশেদের ছবির দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর মেহরিনের ফোন বেজে উঠল।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে প্রথমে একটু চুপ করে রইল।
তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
কথা বলছিল খুব আস্তে।
সোহান শুধু তার মুখ দেখছিল—কখনো শক্ত, কখনো ফাঁকা।
শেষে ফিরে এসে সে ফোনটা টেবিলের ওপর রাখল।
কিছুক্ষণ কিছু বলল না।
সোহান জিজ্ঞেস করল, “কি হলো?”
মেহরিন প্রথমে উত্তর দিল না।
তারপর বলল, “আজ ওর আইনজীবী ফোন করেছিল।”
অর্ণব তাকাল।
মেহরিনের মুখে কোনো নাটকীয়তা নেই।
শুধু ক্লান্তি।
সে ধীরে বলল, “বিচ্ছেদটা শেষ পর্যন্ত হয়ে যাবে মনে হয়।”
সোহান কিছু বলল না।
মেহরিন জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার কণ্ঠ একটু নিচু হয়ে এল।
“এতদিন ভাবতাম, থেমে আছে মানে বেঁচে আছে।
এখন মনে হয়, থেমে থাকাই ছিল ভুল।”
অর্ণব খাটের পাশে বসে মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ পর বলল, “তুই কাউকে কিছু বলিসনি কেন?”
মেহরিন কাঁধ না ঝাঁকিয়ে বলল, “কার কাছে?”
অর্ণব উত্তর দিল না।
সে শুধু রাশেদের ছবিটার দিকে তাকাল।
ছবিতে দুই ভাই।
একজন আছে, একজন হারিয়ে গেছে।
আর ঘরের ভেতরে বসে থাকা তিনজনের মধ্যে প্রত্যেকেই যেন নিজের একটা করে হারিয়ে যাওয়া অংশ গুনছে।
সন্ধ্যার দিকে সোহানের স্ত্রীর ফোন এলো।
সে ফোনটা কানে দিতেই ওপাশ থেকে খুব শান্ত গলা।
“তুমি আবার ওই বাড়িতে?”
সোহান একটু থামল।
“হ্যাঁ।”
“কতদিন ধরে?”
“কয়েকদিন।”
“কয়েকদিন না, সোহান। তুমি অনেকদিন ধরে ওখানেই আছ।”
সোহান চুপ করে রইল।
ওপাশে কণ্ঠটা একটু কঠিন হলো।
“তুমি মৃত মানুষের গল্প নিয়ে বাঁচছ।
জীবিত মানুষদের সঙ্গে নেই।”
এই লাইনটা সোজা এসে লাগল।
সোহান কিছু বলতে পারল না।
ফোনের ওপাশে আর কোনো বাড়তি ব্যাখ্যা এল না।
সেই দরকারও ছিল না।
একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল।
ফোনটা নামিয়ে রাখতেই সোহানের চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা রাশেদের ছবিতে।
মনে হলো, মৃত মানুষগুলো যেন একটু একটু করে জীবিতদের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে।
সোহান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
উপরে ফিরে এসে দেখল, মেহরিন চেয়ারে বসে আছে।
অর্ণব জানালার পাশে।
রাশেদের ছবিটা তখনও টেবিলের ওপর।
সোহান ধীরে বলল, “আমরা তিনজনই ভাঙছি।”
কেউ উত্তর দিল না।
কিন্তু কথাটা ঘরের ভেতর ঠিকই থেকে গেল।
মেহরিন খুব আস্তে বলল, “আমি বলছি না, সত্য জানার দরকার নেই।
আমি বলছি—সব সত্য একসাথে নিতে গেলে ভেঙে যেতে হয়।”
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
“তাহলে থামবি?”
মেহরিন একটু থেমে বলল, “না।
থামব না।
কিন্তু তুইও ভাব, এগুলো জানার পর কী বাঁচবে।”
অর্ণব কিছু বলল না।
সন্ধ্যা নামতে নামতে ঘর আরও নিঃশব্দ হলো।
টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরি।
পাশে রাশেদের ছবি।
আর তার সঙ্গে তিনটি মানুষের বর্তমান জীবন—যা ধীরে ধীরে পুরোনো কাগজের মতোই ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে।
সোহান শেষবারের মতো ছবিটার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে বলল, “আমরা এতদিন বাবার অতীত খুঁজছিলাম।
আজ বুঝলাম—বর্তমানও হারিয়ে যেতে পারে।
সম্ভবত এ কারণেই কিছু মানুষ সত্য লুকিয়ে রাখে।
অথবা হয়তো এ কারণেই কিছু ডায়েরি শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত থেকে যায়।”
কেউ উত্তর দিল না।
শুধু জানালার ওপারে অন্ধকার নেমে এল।
আর সেই অন্ধকারের মধ্যে, টেবিলের ওপর রাশেদের ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে রইল।