চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ১১ : হারিয়ে যাওয়া মানুষ
কাগজগুলো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল।
সন্ধ্যার আলো তৃতীয় তলার ঘরে ঢুকে পড়ছে। জানালার ধারে ধুলো জমে আছে। ছবিটা পাশে, ডায়েরিটা বন্ধ। আর আলমারির নিচে একগাদা পুরোনো নথি।
সোহান প্রথমে পারিবারিক রেজিস্টারটা হাতে নিল।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে এক জায়গায় থামল।
পিতা:
...
সন্তান:
১. আব্দুল কাদের
২. রাশেদ
সোহান আঙুল দিয়ে লাইনটা ছুঁয়ে বলল, “দেখ... রাশেদ বাবার পরেই।”
মেহরিন একটু এগিয়ে এল।
“তাহলে সে সত্যিই ছিল।”
অর্ণব কোনো কথা বলল না।
সে শুধু নথিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আরেকটা কাগজ বেরিয়ে এল।
একটি পুরোনো স্কুল-ফি জমার রসিদ।
কাগজটা হলদে, ভাঁজে ভাঁজে শক্ত হয়ে গেছে।
নিচে কালি দিয়ে টানা দস্তখত।
সোহান কাগজটা উল্টে দেখল।
তারপর ধীরে বলল, “এটা ওর স্বাক্ষর।”
মেহরিন জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে বুঝলি?”
সোহান একটু থেমে বলল, “একটা মানুষকে অনেক সময় ছবিতে চেনা যায় না। নামেও না। কিন্তু তার হাতের দস্তখত, তার টান, তার তাড়াহুড়ো—এসব দেখলে মনে হয়, সে কোথাও ছিল।”
অর্ণব সোজা হয়ে বসে পড়ল।
“মানে কেউ ছিল, পড়ত, ফেলত, হাসত, বকুনি খেত।”
সোহান মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
এই কথাটার মধ্যে রাশেদ প্রথমবার একটু মানুষ হয়ে উঠল।
শুধু নাম নয়।
একজন ছেলে।
একজন ছাত্র।
একটা হাতের লেখা।
মেহরিন ফি-র রসিদটা নিয়ে আরেকটু খুঁটিয়ে দেখল।
সেখানে নামের পাশে নম্বর, তারিখ, আর বিদ্যালয়ের সিল।
কোনো ছবি না থাকলেও এই কাগজটা যেন বলছে—রাশেদ ছিল, আর তার হাতের ছাপও ছিল।
করিম চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ।
তিনি নথিটার দিকে তাকালেন একবার।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “এই কাগজটা এখনো আছে?”
সোহান তাঁর দিকে তাকাল।
এবার প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো না।
“আপনি জানতেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
করিম চাচা মাথা নিচু করলেন।
“জানতাম।”
অর্ণব ভ্রু কুঁচকে বলল, “তাহলে আগে বললেন না কেন?”
করিম চাচা কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু রসিদটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সোহান আবার নথির ভাঁজে হাত দিল।
ভেতর থেকে একটা ছোট, ভাঁজ করা ছবি বেরিয়ে এল।
ছবিটা খুব পরিষ্কার নয়।
দুইজন ছেলে স্কুলের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে।
একজনের মুখ একটু বড়, চুল এলোমেলো।
আরেকজনের ঠোঁটে অল্প হাসি।
ছবিটা উল্টাতেই পেছনে লেখা দেখা গেল।
কাদের ও রাশেদ
আর কিছু না।
সোহান ছবিটা ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
কথাটা পড়ে যেন ঘরের ভেতর আলাদা একটা বাতাস ঢুকে গেল।
মেহরিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “দুটি নামই যথেষ্ট।”
অর্ণব হেসে ফেলল না।
সে শুধু বলল, “কাগজে নাম আছে। বাড়িতে নাম নেই।”
সোহান মাথা না তুলে বলল, “এটাই তো সমস্যা।”
করিম চাচা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “ওই ঘটনার পর আপনার দাদাজান বলেছিলেন—এই বাড়িতে আর রাশেদের নাম কেউ নেবে না।”
সোহান সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
“কোন ঘটনা?”
করিম চাচা এবারও উত্তর দিলেন না।
কিন্তু এই নীরবতায় কোনো ভান ছিল না।
এটা এমন এক চুপ, যা জানে, কিন্তু বলতে চায় না।
মেহরিন কাগজগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে বলল, “তাহলে নামটা শুধু মুছে ফেলা হয়নি।”
সোহান ছবিটা আবার উল্টে দেখল।
কাদের ও রাশেদ
এই দুই নামের মধ্যে এখন আর কেবল স্মৃতি নেই।
আছে একটা অসমাপ্ত ইতিহাস।
অর্ণব ধীরে বলল, “একটা মানুষকে এমনভাবে মুছে ফেলা যায়?”
মেহরিন উত্তর দিল, “চেষ্টা করলে যায়।”
করিম চাচা এবার ছবিটার দিকে একবার তাকালেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “সব ছবি ফেলা হয় না বাবা। কিছু লুকিয়ে রাখা হয়।”
এই বাক্যটা ঘরের মধ্যে থেমে গেল।
সোহান খোঁজার শেষে আলমারির নিচে আর কিছু পায়নি।
কোনো নতুন খাম নেই।
নতুন কোনো কাগজও না।
শুধু এই নথিগুলো, জন্মসনদ, রসিদ, আর ছবিতে দুইটি নাম।
সে টেবিলের ওপর সব গুছিয়ে রাখল।
ছবিটা একপাশে, রসিদ আর জন্মসনদ আরেকপাশে।
মেহরিন ধীরে বলল, “রাশেদ ছিল।”
সোহান মাথা নাড়ল। “ছিল।”
অর্ণব জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আর আমাদের কাছে সে কখনো ছিলই না।”
কেউ উত্তর দিল না।
সোহান ছবিটার দিকে শেষবারের মতো তাকাল।
কাগজে নাম আছে।
বাড়িতে নাম নেই।
এই এক লাইনের ভিতরেই যেন পুরো বাড়ির ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
সে ছবিটা টেবিলের ওপর রাখল।
কেউ হাত বাড়াল না।
কেউ ছবিটা আর উল্টে দেখল না।
শুধু দুইটি নাম রয়ে গেল—
কাদের ও রাশেদ।