বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ডায়ানা: চাঁদ, শিকার, বনভূমি ও নারীদের রক্ষাকর্ত্রী রোমান দেবী

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

ডায়ানা: চাঁদ, শিকার, বনভূমি ও নারীদের রক্ষাকর্ত্রী রোমান দেবী
চাঁদের আলোয় বন, শিকার ও জীবনরক্ষার দেবী ডায়ানা।

মার্কারি ও অ্যাপোলোর বার্তা, সংগীত এবং ভবিষ্যদ্বাণীর জগৎ থেকে মানুষের জীবন যখন গৃহের দিকে ফিরে আসে, তখন তার চারপাশের প্রকৃতিও নতুন গুরুত্ব পায়। নগরের বাইরে ছিল বন, পাহাড়, অন্ধকার পথ এবং বন্য প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র। সেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ সীমিত; আবার সেই প্রকৃতির মধ্যেই খাদ্য, জল ও আশ্রয়ের উৎস। রোমান বিশ্বাসে এই সীমান্তজগতের অন্যতম প্রধান দেবী ছিলেন ডায়ানা। তিনি শিকার ও বনভূমির দেবী হলেও চাঁদ, প্রসব এবং নারীর সুরক্ষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁকে জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অভিভাবক করে তুলেছিল।

ডায়ানার পরিচয়ে প্রাচীন ইতালীয় উপাসনা এবং গ্রিক আর্টেমিসের কাহিনি মিলিত হয়েছে। তাঁকে শুধু আর্টেমিসের নামবদল হিসেবে দেখলে ইতালির নিজস্ব ধর্মীয় ঐতিহ্য হারিয়ে যায়। আবার গ্রিক প্রভাব উপেক্ষা করলে তাঁর পরিচিত পৌরাণিক জীবনী ব্যাখ্যা করা কঠিন। রোমান সমীকরণে তিনি জুপিটার ও লাতোনার কন্যা, অ্যাপোলোর যমজ বোন। ধনুক, তূণীর, হরিণ এবং শিকারি কুকুর তাঁর পরিচিত প্রতীক। কিন্তু উপাসনার স্থানভেদে দেবীর গুরুত্ব একরকম ছিল না; কোথাও বন, কোথাও নাগরিক সম্পর্ক, কোথাও প্রসবের নিরাপত্তা সামনে এসেছে।

শিকারি হিসেবে ডায়ানার ক্ষমতা শুধু প্রাণী হত্যা করার দক্ষতা নয়। তিনি বন্য প্রাণীদের জগতে বিচরণ করেন এবং মানুষের অনধিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারেন। শিকারি তাঁর অনুকূলতা চাইতে পারে, কিন্তু দেবীর পবিত্র সীমা মানার দায়িত্বও থাকে। ডায়ানা একই সঙ্গে শিকারি এবং বন্যজগতের অধিষ্ঠাত্রী; এই দুই পরিচয় প্রাচীন বিশ্বাসে পরস্পরবিরোধী ছিল না। তাঁকে আধুনিক পরিবেশরক্ষার ধারণার সরাসরি প্রতিরূপ বলা ঠিক নয়, যদিও তাঁর কাহিনি প্রকৃতির সামনে মানুষের ক্ষমতার সীমা অনুভব করায়।

ডায়ানার সবচেয়ে বিখ্যাত ইতালীয় উপাসনাকেন্দ্র ছিল আরিচিয়ার কাছে নেমি হ্রদের পবিত্র বন। সেখানে তিনি ডায়ানা নেমোরেনসিস, অর্থাৎ বনের ডায়ানা হিসেবে পরিচিত। পাহাড়ে ঘেরা হ্রদ, বৃক্ষছায়া ও উপাসনাস্থল এক বিশেষ ধর্মীয় ভূদৃশ্য তৈরি করেছিল। হ্রদকে পরবর্তী ঐতিহ্যে দেবীর আয়না বলা হয়েছে। কিন্তু এই সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে শুধু নিস্তব্ধ প্রকৃতি ছিল না; তীর্থযাত্রী, নিবেদন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও ছিল। নেমির বন ছিল মানুষের বাইরে থাকা দৈবপ্রকৃতি এবং মানুষের সক্রিয় উপাসনার মিলনস্থল।

এই উপাসনাকেন্দ্রের পুরোহিতকে বলা হতো রেক্স নেমোরেনসিস, অর্থাৎ বনের রাজা। প্রাচীন বিবরণে তাঁর পদ লাভের সঙ্গে সহিংস দ্বন্দ্ব যুক্ত। কিছু বর্ণনায় পালিয়ে আসা দাস একটি নির্দিষ্ট শাখা ভেঙে বর্তমান পুরোহিতকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার পেত এবং তাঁকে হত্যা করে পদ অধিকার করতে পারত। তবে এই প্রথার উৎপত্তি, পরিবর্তন ও বাস্তব প্রয়োগের সব বিস্তারিত জানা নেই। শান্ত বনভূমির দেবীর উপাসনায় এমন বিপজ্জনক পুরোহিতীয় উত্তরাধিকার থাকা দেখায়, প্রাচীন পবিত্রতা সব সময় কোমলতা বা অহিংসতার সমার্থক ছিল না।

নেমির শাখা ও পুরোহিতের কাহিনি পরে নানা বড় ব্যাখ্যার ভিত্তি হয়েছে। কেউ এতে ঋতুচক্র, রাজত্ব কিংবা উর্বরতার প্রতীক খুঁজেছেন। কিন্তু আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ আলাদা। এনিয়াসের পাতালযাত্রার সোনালি শাখার সঙ্গে নেমির প্রথার তুলনা করা হলেও দুটিকে হুবহু একই ধর্মীয় ঘটনা বলা যায় না। পৌরাণিক প্রতীকের মিল ইতিহাসের নিশ্চিত পরিচয় তৈরি করে না। ডায়ানার রহস্যময় জগৎ বোঝার জন্য অনুমানের আকর্ষণের পাশাপাশি তথ্যের সীমাও মনে রাখা প্রয়োজন।

রোম নগরে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ উপাসনাকেন্দ্র ছিল আভেন্তাইন পাহাড়ে। প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্য রাজা সারভিয়ুস তুল্লিয়ুসের সঙ্গে যুক্ত। প্রাচীন বিবরণে এই মন্দির লাতিন জনগোষ্ঠীগুলোর যৌথ ধর্মীয় সম্পর্ক এবং রোমের নেতৃত্বের দাবির সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ বনের দেবী নাগরিক রাজনীতির বাইরের কেউ ছিলেন না। তাঁর উপাসনা বিভিন্ন সম্প্রদায়কে এক স্থানে যুক্ত করতে পারত। ডায়ানার উৎসবের সঙ্গে দাসদের অংশগ্রহণ ও অবকাশের সম্পর্কও ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। এই সামাজিক বিস্তার তাঁর মর্যাদাকে শুধু অভিজাত শিকারিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।

আগস্টের ডায়ানা-উৎসবে মশাল ও সমবেত উপাসনার বিশেষ আবহ ছিল। নেমির উপাসনাকেন্দ্রে নিবেদনকারী মানুষের উপস্থিতি দেবীর সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সম্পর্ক দেখায়। রোগ, সন্তানলাভ এবং শরীরের কল্যাণের জন্য মানুষ তাঁর সাহায্য চাইত; উপাসনাস্থলের নিবেদনসামগ্রী সেই প্রয়োজনের আভাস দেয়। নারীর রক্ষাকর্ত্রী বলতে তাই শুধু একটি সাধারণ প্রশংসাসূচক পরিচয় বোঝায় না। গর্ভধারণ ও প্রসবের মতো বিপজ্জনক অভিজ্ঞতায় দেবীর সহায়তা চাওয়া ছিল বাস্তব উদ্বেগের ধর্মীয় প্রকাশ। এই অভিজ্ঞতা মা, পরিবার ও সম্প্রদায়ের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ডায়ানা কুমারী দেবী হিসেবে পরিচিত হলেও প্রসবের সহায়ক ভূমিকা পালন করেন—আধুনিক পাঠকের কাছে এই সম্পর্ক অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু প্রাচীন দেবজগতে ব্যক্তিগত পৌরাণিক জীবন এবং উপাসনার ক্ষমতা এক নিয়মে বাঁধা ছিল না। দেবী নিজে বিবাহ বা মাতৃত্ব গ্রহণ না করেও নারীর জন্মদানের বিপদ রক্ষা করতে পারেন। আর্টেমিসের সঙ্গে সমীকরণ এই পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করে। জুনো লুসিনার মতো দেবীরও প্রসবসংক্রান্ত ভূমিকা ছিল; ডায়ানা নারীর জীবনের একমাত্র রক্ষক ছিলেন না। একই প্রয়োজনে একাধিক দৈবশক্তির সাহায্য চাওয়া সম্ভব ছিল।

চাঁদের সঙ্গে ডায়ানার পরিচয়ও ধীরে গড়ে ওঠা সমীকরণের অংশ। রোমে লুনার পৃথক উপাসনা ছিল, যেমন গ্রিক ঐতিহ্যে সেলেনের নিজস্ব পরিচয় ছিল। পরবর্তী সাহিত্য ও শিল্পে ডায়ানা, চাঁদ এবং কখনো হেকাটের পাতালসম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য একত্র হয়। ফলে তাঁকে বহুস্তরীয় বা ত্রিমুখী দেবী হিসেবেও কল্পনা করা হয়েছে। সব সময়, সব উপাসনাস্থলে ডায়ানা ও লুনা সম্পূর্ণ অভিন্ন ছিলেন—এমন বলা যায় না। অর্ধচন্দ্র তাঁর পরিচিত প্রতীক হলেও তা দেবীর সমস্ত প্রাচীন ইতিহাস ব্যাখ্যা করে না।

তাঁর কঠোরতার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ অ্যাক্টিয়নের কাহিনি। ওভিদের বর্ণনায় শিকারি অ্যাক্টিয়ন অনিচ্ছাকৃতভাবে দেবী ও সঙ্গিনীদের স্নানের স্থানে পৌঁছে যায়। ডায়ানা তাকে হরিণে রূপান্তরিত করেন, এবং নিজের শিকারি কুকুরেরা তাকে চিনতে না পেরে আক্রমণ করে। এই গল্প পবিত্র সীমা লঙ্ঘনের ভয়াবহ পরিণতি দেখায়। কিন্তু ঘটনাটি নিছক অপরাধ ও ন্যায্য শাস্তির সরল উদাহরণ নয়; দুর্ঘটনার জন্য এত কঠোর পরিণতি পাঠকের মনে প্রশ্নও তোলে। দেবীর অধিকার এবং মানুষের অসহায়তা কাহিনিতে একসঙ্গে উপস্থিত থাকে।

কালিস্টোর গল্পেও ডায়ানার অনুসারীদের জীবন কঠোর নিয়মের মধ্যে পড়ে। বিভিন্ন সংস্করণে জুপিটারের প্রতারণা বা বলপ্রয়োগের শিকার কালিস্টো গর্ভবতী হলে তাঁর অবস্থা প্রকাশ পায় এবং তিনি ডায়ানার সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। পরে তাঁর রূপান্তর ও নক্ষত্রে পরিণতির কাহিনি আসে। এখানে দেবীকে নারীর রক্ষাকর্ত্রী বলেই সব পৌরাণিক আচরণকে সহানুভূতিশীল বলা যায় না। সাহিত্যিক গল্পে যৌন সহিংসতা, দোষারোপ এবং সামাজিক বহিষ্কারের অস্বস্তিকর দিক রয়েছে। উপাসনার আশ্রয়দাত্রী পরিচয় ও কাহিনির কঠোরতা পাশাপাশি বোঝা জরুরি।

অন্যদিকে হিপ্পোলিটাসের সঙ্গে ডায়ানার সম্পর্ক সুরক্ষার একটি ভিন্ন ছবি দেয়। গ্রিক কাহিনির এই তরুণ আর্টেমিসের অনুরাগী; মৃত্যুর পরে তাঁর পুনর্জীবন এবং ইতালিতে বিরবিয়ুস নামে অবস্থানের ঐতিহ্যও রয়েছে। নেমির উপাসনাজগতে বিরবিয়ুসের উপস্থিতি গ্রিক বীরকাহিনিকে ইতালির পবিত্র ভূদৃশ্যে স্থান দেয়। এতে ডায়ানা শুধু শাস্তিদাত্রী নন; বিশ্বস্ত অনুসারীর জন্য নতুন আশ্রয় দিতে সক্ষম দেবীও। একই দেবীর পরিচয়ে রক্ষা, স্বাধীনতা, নিষেধ এবং ভয় বিভিন্ন গল্পে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।

ডায়ানার গুরুত্ব তাই ধনুক বা চাঁদের প্রতীকে শেষ হয় না। নেমির বন, আভেন্তাইনের মন্দির, প্রসবের প্রার্থনা এবং বন্যজগতের কাহিনি তাঁকে রোমান জীবনের বহু সীমান্তে উপস্থিত রাখে। তিনি সেই মুহূর্তগুলোর দেবী, যেখানে মানুষ পরিচিত নিরাপত্তা ছেড়ে অজানা বিপদের সামনে দাঁড়ায়। তাঁর আশ্রয় প্রত্যাশিত, আবার তাঁর পবিত্র অধিকার অমান্য করার ভয়ও প্রবল। বন থেকে মানুষ যখন নগরে ফিরে আসে, তখন সেই বিপদের আরেক রূপ দেখা দেয় আগুনে—যে শক্তি খাদ্য রান্না করে ও গৃহ উষ্ণ রাখে, আবার অসতর্কতায় সবকিছু ধ্বংস করতে পারে। সেই আগুনের দৈবজগৎ রোমানদের বিশ্বাসে নতুন অধ্যায় খুলে দেয়।