বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রোমুলাসের রহস্যময় অন্তর্ধান: প্রথম রাজা থেকে দেবতা কুইরিনাস

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

রোমুলাসের রহস্যময় অন্তর্ধান: প্রথম রাজা থেকে দেবতা কুইরিনাস
ঝড়ের আড়ালে অন্তর্ধান, জনস্মৃতিতে দেবতার আবির্ভাব।

স্যাবাইনদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সমঝোতার পর রোম একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল। রোমুলাসের কর্তৃত্বের নিচে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী একত্র হয়, আর নগরের জীবনে সামরিক শক্তির পাশাপাশি ধর্মীয় স্বীকৃতির গুরুত্ব বাড়তে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায় এসে দাঁড়ায় এক অদ্ভুত প্রশ্নের সামনে। যিনি রোমের সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন এবং প্রথম রাজা হয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যু কোথায়? রোমান কিংবদন্তি রোমুলাসের শেষ মুহূর্তকে সাধারণ মৃত্যুর দৃশ্য হিসেবে তুলে ধরে না; ঝড়, অন্তর্ধান, রাজনৈতিক সন্দেহ এবং দেবত্বের দাবি দিয়ে ঘিরে রাখে।

প্রচলিত ধারায় রোমুলাস বহু বছর রাজত্ব করেন। কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের ছবি সব বিবরণে সমান প্রশংসামূলক নয়। কিছু প্রাচীন লেখকের কাছে তিনি ক্রমে নিজের ক্ষমতা বাড়িয়েছিলেন এবং প্রবীণ অভিজাতদের পরামর্শকে কম গুরুত্ব দিতেন। রাজা ও সেনেটরদের মধ্যে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন অন্তর্ধানের গল্পে বিশেষ তাৎপর্য পায়। রোমের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর মর্যাদা বিশাল, অথচ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে তাঁর শেষ পরিণতি নিয়ে অলৌকিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার ব্যাখ্যাও জন্ম নেয়।

সবচেয়ে পরিচিত কাহিনিতে রোমুলাস নগরের বাইরে সৈন্যদের পরিদর্শন বা সমাবেশ পরিচালনা করছিলেন। স্থানটি ক্যাম্পাস মার্তিয়ুস অঞ্চলের ক্যাপ্রা জলাভূমি বা তার কাছাকাছি এলাকা হিসেবে পরিচিত। তাঁর চারপাশে সৈন্য, নাগরিক এবং সেনেটরদের উপস্থিতি ছিল। হঠাৎ প্রবল ঝড় ওঠে; বজ্রপাত, ঘন মেঘ এবং অন্ধকার সমাবেশকে বিপর্যস্ত করে। মানুষ ছত্রভঙ্গ হয় বা দৃশ্য হারিয়ে ফেলে। আবহাওয়া শান্ত হলে দেখা যায়, রাজা সেখানে নেই। মেঘ সরে গেছে, কিন্তু রোমুলাসের আসন শূন্য—এই অনুপস্থিতিই কিংবদন্তির কেন্দ্রীয় দৃশ্য।

কাহিনির শক্তি আসে প্রত্যক্ষ দৃশ্যের এই বিচ্ছেদ থেকে। ঝড়ের আগে সবাই রাজাকে দেখেছিল; ঝড়ের পরে আর কেউ তাঁকে খুঁজে পায় না। মাঝের সময় কী ঘটেছিল, তা সাধারণ মানুষের অজানা। তাঁর দেহও সামনে আনা হয় না। এই শূন্যতা বিভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে। রাজাকে দেবতারা তুলে নিয়েছেন—এমন দাবি যেমন সম্ভব হয়, তেমনি তাঁকে গোপনে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন সন্দেহও ছড়ায়। কিংবদন্তিতে প্রকৃতির অন্ধকার মানুষের জ্ঞানের সীমা হয়ে দাঁড়ায়; সেই সীমার ওপারে বিশ্বাস ও রাজনীতি নিজেদের উত্তর নির্মাণ করে।

দেবত্বের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রোমুলাসকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁর পিতা মার্স হওয়ায় এই উত্তরণ পৌরাণিক বংশপরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়। যে শিশু দৈবপিতৃত্ব নিয়ে জন্মেছিল এবং অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছিল, তার জীবনের শেষেও দৈবহস্তক্ষেপ উপস্থিত থাকে। পরবর্তী কবিতায় মার্সের মাধ্যমে তাঁকে দেবলোকের দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আরও বিস্তৃত হয়। এই রূপান্তরে প্রতিষ্ঠাতা আর শুধু অতীতের শাসক থাকেন না; রোমের ভবিষ্যৎ রক্ষাকারী দেবশক্তি হিসেবে উপাসনার যোগ্য হয়ে ওঠেন।

অন্যদিকে সন্দেহের কাহিনি বলে, সেনেটরেরা রোমুলাসকে হত্যা করেছিলেন। কিছু বিবরণে তাঁর দেহ খণ্ডিত করে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এর পেছনে রাজার সঙ্গে অভিজাতদের বিরোধকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়। ঝড়ের আড়াল, রাজাকে ঘিরে থাকা অল্পসংখ্যক ব্যক্তির উপস্থিতি এবং দেহ না পাওয়া এই সন্দেহকে শক্তিশালী করে। তবে সেনেটরদের হাতে হত্যার বিবরণও নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি প্রাচীন ঐতিহ্যে সংরক্ষিত একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যা। অলৌকিক কাহিনি অপ্রমাণিত বলে রাজনৈতিক হত্যার কাহিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায় না।

এই দ্বিধার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন প্রোকুলুস জুলিয়ুস। প্রচলিত বিবরণে তিনি জনসমক্ষে জানান যে রোমুলাস তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা তখন সাধারণ মানুষের চেয়ে মহিমান্বিত অবয়বে উপস্থিত। তিনি রোমের মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে বলেন—তাদের নগরের সামনে মহান ভবিষ্যৎ রয়েছে এবং সামরিক শক্তি ও প্রস্তুতি বজায় রাখতে হবে। বিভিন্ন লেখকের বর্ণনায় বক্তব্যের ভাষা ও বিস্তারিত ভিন্ন। কিন্তু মূল ভূমিকা এক: প্রোকুলুসের সাক্ষ্য অন্তর্ধানের অনিশ্চয়তাকে দেবত্বের দাবির দিকে নিয়ে যায়।

প্রোকুলুসের বক্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে পড়লে তার কার্যকারিতা বোঝা যায়। রাজা হারিয়ে যাওয়ার পর জনসমাজে আতঙ্ক, ক্ষোভ এবং অভিজাতদের বিরুদ্ধে সন্দেহ দেখা দিতে পারে। তাঁর আবির্ভাবের খবর সেই উত্তেজনাকে নতুন ব্যাখ্যা দেয়। মৃত্যু বা হত্যার প্রশ্নের জায়গায় আসে দেবতায় উত্তরণের বিশ্বাস। প্রতিষ্ঠাতা অনুপস্থিত হলেও তাঁর কর্তৃত্ব শেষ হয় না; বরং মানবিক বিরোধের ওপরে উঠে পবিত্র মর্যাদা পায়। তবে সাক্ষ্যটি সচেতনভাবে বানানো হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তও প্রমাণ ছাড়া দেওয়া যায় না। কাহিনি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর ছিল, এটুকুই সতর্কভাবে বলা যায়।

রোমুলাসের দেবত্বের সঙ্গে যুক্ত নাম কুইরিনাস। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: কুইরিনাসকে কেবল রোমুলাসের অন্তর্ধানের পরে তৈরি হওয়া নতুন দেবতা বলা ঠিক নয়। তাঁর উপাসনার নিজস্ব প্রাচীন ভিত্তি ছিল, এবং পরে রোমুলাসের সঙ্গে তাঁর পরিচয় একীভূত হয়। কুইরিনাল পাহাড়, রোমান নাগরিকদের কুইরিতেস পরিচয় এবং স্যাবাইন সম্পর্কের সঙ্গে এই দেবতার নামের যোগ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু শব্দের উৎপত্তি ও দেবতার আদিম চরিত্র নিয়ে নিশ্চিত একমত সিদ্ধান্ত নেই। তাই একটি সহজ ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে তুলে ধরা অনুচিত।

কুইরিনাসের প্রাচীন গুরুত্ব বোঝা যায় তাঁর পুরোহিতের মর্যাদা থেকে। বৃহস্পতি ও মার্সের বিশেষ পুরোহিতদের পাশাপাশি কুইরিনাসের ফ্লামেনও প্রধান পুরোহিতদের একজন ছিলেন। বৃহস্পতি, মার্স ও কুইরিনাসকে রোমের প্রাচীন ধর্মীয় বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ দেবসমষ্টি হিসেবে আলোচনা করা হয়। তবে তাঁদের ভূমিকা একেবারে কঠোর তিনটি বিভাগে আটকে দেওয়া যায় না। কুইরিনাসের উপাসনায় নাগরিক সমাজ এবং কৃষিজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত দিকও দেখা যায়। রোমুলাসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগে থেকেই কুইরিনাস রোমের ধর্মীয় জীবনে গভীর স্থান অধিকার করেছিলেন।

রোমুলাসকে কুইরিনাস হিসেবে দেখা সেই প্রাচীন উপাসনাকে প্রতিষ্ঠাকাহিনির সঙ্গে যুক্ত করে। নগরের রাজা এখন নাগরিক সম্প্রদায়ের দৈবপ্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। জীবিত অবস্থায় তাঁর কাজ ছিল বিভিন্ন মানুষকে একটি রাজনৈতিক সমাজে সংগঠিত করা; দেবত্বের পরে তাঁর স্মৃতি সেই সমাজের স্থায়িত্বের প্রতীক হয়। এই একীভূতকরণে পুরোনো দেবতার পরিচয় ও প্রতিষ্ঠাতা বীরের জীবনী পরস্পরকে নতুন অর্থ দেয়। ফেব্রুয়ারির কুইরিনালিয়া উৎসবের মতো উপাসনাপ্রথাও দেখায় যে কুইরিনাসের উপস্থিতি শুধু একটি নাটকীয় গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না।

পরবর্তী সাহিত্য এই দেবত্বের কাহিনিকে আরও ব্যক্তিগত রূপ দেয়। ওভিদের বর্ণনায় রোমুলাসের স্ত্রী হেরসিলিয়াও স্বামীর অনুপস্থিতিতে শোকাহত হন এবং পরে দৈবরূপ লাভ করেন; তাঁর সঙ্গে হোরা নাম যুক্ত হয়। এই পর্ব মানবপরিবারের সম্পর্ককে দেবজগতেও অব্যাহত রাখে। কিন্তু সব সাহিত্যিক বিবরণকে একই যুগের সাধারণ বিশ্বাস হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কবির কল্পনা, পুরোনো উপাসনা এবং প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক স্মৃতি এখানে বিভিন্ন স্তরে কাজ করে। রোমান পুরাণের বিস্তার বোঝার জন্য এসব স্তরের পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

রোমুলাসের উত্তরণ পরবর্তী রোমান শাসকদের দেবত্ব নিয়ে চিন্তার একটি পূর্বদৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিষ্ঠাতা দেবতা হতে পারলে রাষ্ট্রের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দৈবমর্যাদাও কল্পনা করা সম্ভব হয়। কিন্তু রোমুলাসের পৌরাণিক অন্তর্ধান এবং পরবর্তী সম্রাটদের আনুষ্ঠানিক দেবত্বপ্রদান অভিন্ন প্রক্রিয়া নয়। পরের যুগে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও উপাসনার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা কাজ করেছে। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠাতার কাহিনি একটি শক্তিশালী ধারণা রেখে যায়—রাষ্ট্রের জন্য বিশেষ অবদান রাখা মানুষকে মৃত্যুর পরে পবিত্র স্মৃতি ও উপাসনার মাধ্যমে নতুন অবস্থান দেওয়া যেতে পারে।

ঝড়ের মধ্যে রোমুলাসের অন্তর্ধান তাই রোমের প্রতিষ্ঠাকাহিনিকে একই সঙ্গে শেষ করে এবং নতুনভাবে চালু রাখে। একজন রাজা চলে যান, কিন্তু কুইরিনাসের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠাতা নগরের ধর্মীয় জীবনে থেকে যান। হত্যার সন্দেহ তাঁর মানবিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মনে করিয়ে দেয়; দেবত্বের দাবি সেই দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে রোমের স্থায়িত্ব ঘোষণা করে। কিংবদন্তির রহস্যের কেন্দ্র শুধু রোমুলাস কোথায় গেলেন, তা নয়—রোম কেন তাঁর অনুপস্থিতিকে দৈবউপস্থিতিতে রূপ দিল। প্রতিষ্ঠাতার যুগ শেষ হওয়ার পর নগরের সামনে এখন উত্তরাধিকার ও শাসনের প্রশ্ন। যুদ্ধজয়ের স্মৃতি বহন করা রোমকে শান্তি, আচার এবং দেবতাদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্কের পথ দেখাতে পরবর্তী রাজা নুমা পম্পিলিয়ুসের কাহিনি এগিয়ে আসবে।