বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রোমের জন্ম ও রেমাসের মৃত্যু: রোমুলাসের ভ্রাতৃহত্যার কিংবদন্তি

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

রোমের জন্ম ও রেমাসের মৃত্যু: রোমুলাসের ভ্রাতৃহত্যার কিংবদন্তি
রোমের প্রতিষ্ঠার গৌরবের পেছনে এক ভাইয়ের মৃত্যুর ছায়া।

টাইবারের তীরে বেঁচে যাওয়া দুই ভাইয়ের জীবন যেখানে নতুন নগর প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়েছিল, সেখানেই তাদের যৌথ অভিযাত্রা ভেঙে যায়। রোমুলাসের সামনে এখন নগরকে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান দিয়ে পূর্ণ করার দায়িত্ব, কিন্তু সেই ভবিষ্যতের প্রবেশপথে পড়ে আছে রেমাসের মৃত্যু। নেকড়েমার আশ্রয়ে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা ভাইয়েরা কেন শেষ পর্যন্ত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন? রোমের প্রতিষ্ঠাকিংবদন্তি এই প্রশ্নের একটিমাত্র উত্তর দেয় না; ক্ষমতার দাবি, দৈবলক্ষণের ব্যাখ্যা এবং নগরের পবিত্র সীমানা নিয়ে বিরোধকে একসঙ্গে সামনে আনে। রোমের জন্ম তাই গৌরবের পাশাপাশি অপরাধ ও শোকের স্মৃতিও বহন করে।

আলবা লঙ্গায় আমুলিয়ুসের পতন ঘটিয়ে নুমিতরকে সিংহাসনে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় দুই ভাই একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। সেখানে তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল—অন্যায়ভাবে দখল করা রাজত্ব বৈধ শাসকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু নতুন নগর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা হয়ে যায়। এবার তাদের মধ্যে কে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব পাবেন, তা নির্ধারিত ছিল না। দুজনেরই রাজবংশীয় পরিচয়, সাহস এবং অনুসারী ছিল। যমজ হওয়ায় সাধারণ জ্যেষ্ঠতার দাবিও সহজ সমাধান দেয়নি। একসঙ্গে অত্যাচারীকে পরাজিত করা এবং একসঙ্গে সার্বভৌম ক্ষমতা পরিচালনা করা কাহিনিতে দুটি ভিন্ন সমস্যা হয়ে ওঠে।

নগরের স্থান নির্বাচন এই বিরোধের দৃশ্যমান রূপ। প্রচলিত বিবরণে রোমুলাস প্যালাটাইন পাহাড়কে বেছে নেন, রেমাস আভেন্তাইনকে সমর্থন করেন। পাহাড়ের পছন্দের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নগরের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা যুক্ত হয়ে যায়। কার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, তার ওপর নির্ভর করবে কে নেতৃত্ব দেবেন এবং কার নামে নগর পরিচিত হবে। এই প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত অহংকারের বাইরে অনুসারীদের প্রত্যাশাকেও জড়িয়ে ফেলে। প্রত্যেক ভাইয়ের সমর্থকেরা নিজেদের নেতার দাবিকে বৈধ মনে করে; ফলে পারিবারিক মতভেদ দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধে পরিণত হয়।

সমাধানের জন্য দেবতাদের ইচ্ছা জানার চেষ্টা করা হয়। পাখির উপস্থিতি ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে দৈবলক্ষণ বিচার রোমান রাজনৈতিক ধর্মের পরিচিত অংশ ছিল। দুই ভাই পৃথক স্থানে সংকেতের অপেক্ষা করেন। বহুল প্রচলিত কাহিনিতে রেমাস প্রথমে ছয়টি শকুন দেখেন; পরে রোমুলাস বারোটি দেখেন। কিন্তু সংকেত পাওয়ার পরও ঐকমত্য আসে না। রেমাসের পক্ষ প্রথম দেখার অগ্রাধিকার দাবি করে, রোমুলাসের পক্ষ বেশি সংখ্যাকে শক্তিশালী অনুমোদন বলে ধরে। দেবতাদের সংকেত মানুষের কাছে পৌঁছালেও তার ব্যাখ্যা মানুষের প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত ছিল না।

এখানে বিরোধের গভীরতা বোঝা যায়। দৈবলক্ষণ বিচার করার আগে ফল নির্ধারণের নিয়ম নিয়ে সমঝোতা ছিল কি না, কাহিনি তা স্পষ্ট করে না। ফলে প্রত্যেক পক্ষ নিজের সুবিধাজনক মানদণ্ড সামনে আনে। সংখ্যার গুরুত্ব বনাম সময়ের অগ্রাধিকার নিয়ে তর্ক শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্বের প্রশ্নেই ফিরে আসে। দেবতাদের অনুমোদনের দাবি বিরোধ মেটানোর পরিবর্তে উভয় পক্ষকে নিজেদের অবস্থানে আরও দৃঢ় করে। এই পর্ব দেখায়, ধর্মীয় বৈধতা রাজনৈতিক ক্ষমতার শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যা থাকলে তা সংঘাতের কারণও হয়।

রেমাসের মৃত্যু সম্পর্কে প্রাচীন বিবরণে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। একটি ধারায় দুই পক্ষের উত্তেজিত সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। সবচেয়ে পরিচিত সংস্করণে তিনি রোমুলাসের নতুন প্রাচীর লাফিয়ে অতিক্রম করে সেটিকে উপহাস করেন; ক্রুদ্ধ রোমুলাস তাঁকে হত্যা করেন। আবার অন্য বিবরণে রোমুলাসের সহযোগী হত্যাকারী হিসেবে উপস্থিত। তাই “রোমুলাস কেন ভাইকে হত্যা করেছিলেন” প্রশ্নটি জনপ্রিয় সংস্করণের ভিত্তিতে করা হলেও উত্তর দিতে এই পার্থক্য মনে রাখতে হয়। সব প্রাচীন কাহিনি রেমাসের মৃত্যু একইভাবে বর্ণনা করে না, যদিও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর মৃত্যু ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে।

প্রাচীর লাফিয়ে পার হওয়ার সংস্করণে রেমাসের আচরণ নিছক কৌতুক হিসেবে বিবেচিত হয় না। সদ্য প্রতিষ্ঠিত নগরের প্রতিরক্ষা দুর্বল—এ কথা দেখিয়ে তিনি রোমুলাসের কাজ ও কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন। রোমুলাসের প্রতিক্রিয়া সেই সীমারেখাকে অপরিবর্তনীয় নিয়মে পরিণত করে। কাহিনির কঠোর বার্তা হলো, নগরের সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠাতার নির্দেশ অমান্য করার শাস্তি আত্মীয়তার কারণেও এড়ানো যাবে না। কিন্তু এই ব্যাখ্যা হত্যাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ করে না। বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবারের বন্ধন ভাঙার ভয়াবহ মূল্য সামনে আসে।

নগরসীমার ধর্মীয় গুরুত্ব বোঝা গেলে ঘটনাটির প্রতীকী অর্থ আরও পরিষ্কার হয়। প্রাচীন প্রতিষ্ঠার আচারে লাঙল দিয়ে মাটিতে খাঁজ টেনে নগরের পরিধি নির্ধারণের বিবরণ রয়েছে। বলদ ও গাভী সেই লাঙল টানত; নির্দিষ্ট স্থানে লাঙল তুলে প্রবেশপথ রাখা হতো। এই অনুষ্ঠান বসবাসের সাধারণ জমিকে পৃথক নাগরিক ও ধর্মীয় স্থানে রূপ দেওয়ার ধারণা প্রকাশ করে। সীমারেখার ভেতরে নতুন সম্প্রদায়ের নিয়ম কার্যকর হবে। তাই প্রতিষ্ঠার রেখা অতিক্রম করা কাহিনিতে নতুন শৃঙ্খলার অবমাননা হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়।

তবে প্রাচীর, লাঙলের খাঁজ এবং পোমেরিয়ুমকে এক জিনিস বলা ঠিক নয়। পোমেরিয়ুম ছিল নগরের ধর্মীয় সীমানা; বাস্তব প্রতিরক্ষা প্রাচীরের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকলেও উভয়ের কাজ অভিন্ন ছিল না। রেমাসের মৃত্যু বর্ণনায় কোথাও প্রাচীর, কোথাও নির্মীয়মাণ সীমা প্রধান হয়ে ওঠে। আধুনিক পুনর্কথনে এসব প্রায়ই একত্র করা হয়। কিংবদন্তির প্রতীকী অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রাচীন নগরাচারের বিভিন্ন উপাদানকে হুবহু একই বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কাহিনি এবং পরবর্তী ধর্মীয় প্রথার সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে সরল সমতা নেই।

রেমাসের মৃত্যু রোমানদের কাছে অস্বস্তিকর উত্তরাধিকারও তৈরি করেছিল। প্রতিষ্ঠাতা বীরের হাতে নিজের ভাইয়ের মৃত্যু ঘটলে নগরের জন্ম নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়ে। পরবর্তী রোমান সাহিত্য সেই ঘটনাকে কখনো গৃহযুদ্ধের পূর্বছায়া হিসেবে দেখেছে। একই জনগোষ্ঠীর মানুষ যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে, প্রতিষ্ঠার এই ভ্রাতৃসংঘাত নতুন অর্থ পায়। রোমুলাস ও রেমাস তখন শুধু দুই পৌরাণিক চরিত্র থাকেন না; নিজেদের শক্তি দিয়ে নিজেদের ক্ষতবিক্ষত করা রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে ওঠেন। প্রতিষ্ঠার গৌরবের মধ্যে এই স্মৃতি সহজে মুছে যায়নি।

কিংবদন্তির প্রতিষ্ঠাবর্ষ হিসেবে পরিচিত খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ সালও ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এটি ঘটনাস্থলে লেখা সমকালীন নথি থেকে পাওয়া তারিখ নয়। পরবর্তী রোমান পণ্ডিতেরা রাজাদের শাসনকাল, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার হিসাব এবং কালপঞ্জি মিলিয়ে প্রতিষ্ঠার সময় নির্ধারণের চেষ্টা করেন। তাঁদের সব গণনা একমত ছিল না। ভারোর সঙ্গে যুক্ত হিসাব পরবর্তীতে বিশেষ প্রভাবশালী হয়। ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ রোমের প্রচলিত প্রতিষ্ঠাবর্ষ; রোমুলাস–রেমাসের ঘটনাগুলো সেই বছর ঘটেছিল—এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়।

প্রতিষ্ঠাদিবস হিসেবে ২১ এপ্রিলের পরিচয়ও স্মৃতি ও ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই দিন পালিলিয়া বা পারিলিয়া নামে পশুপালকদের উৎসব পালিত হতো, যেখানে পালেসের কাছে পশুপাল ও রাখালদের মঙ্গল কামনা করা হতো। রোমের জন্মদিনের সঙ্গে এই উৎসবের সংযোগ নগরের পশুপালক অতীতের কাহিনিকে অর্থপূর্ণ করে। কিন্তু ক্যালেন্ডারে নির্দিষ্ট দিন থাকা মানেই সেদিন সম্পূর্ণ নগর হঠাৎ গড়ে উঠেছিল নয়। নগরের জন্মদিন ছিল রোমানদের নিজেদের সম্প্রদায়ের সূচনা স্মরণ এবং ধারাবাহিকতা উদ্‌যাপনের একটি পদ্ধতি।

প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে রোমের প্রাথমিক বিকাশ ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়া। প্যালাটাইনসহ বিভিন্ন পাহাড়ে বসতি, কুটিরজীবন ও সমাধিস্থলের নিদর্শন রয়েছে। সময়ের সঙ্গে পৃথক বসতিগুলোর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়, জনপরিসর গড়ে ওঠে এবং নগরীয় প্রতিষ্ঠান বিকশিত হয়। এই প্রমাণ রোমের প্রাচীনতার ধারণাকে সমর্থন করে, কিন্তু রোমুলাসের হাতে রেমাস নিহত হওয়ার ঘটনা নিশ্চিত করে না। কোনো প্রাচীন প্রাচীর বা বসতির সন্ধান পাওয়াকে নির্দিষ্ট পৌরাণিক চরিত্রের প্রমাণ বলা যায় না। কিংবদন্তি বহু মানুষের দীর্ঘ পরিবর্তনকে দুই ভাইয়ের ব্যক্তিগত নাটকে সংক্ষিপ্ত করেছে।

রেমাসের মৃত্যুর পর রোমুলাস একক প্রতিষ্ঠাতা ও শাসক হয়ে ওঠেন। তাঁর নামে রোমের নামকরণের গল্প প্রচলিত হয়, আর মৃত ভাই প্রতিষ্ঠার ছায়ায় থেকে যান। রোমের জন্মকথার শক্তি এখানেই—এটি বিজয়ের স্মৃতির পাশাপাশি সেই বিজয়ের মূল্যও ধরে রাখে। নতুন সীমারেখা রক্ষা পেল, কিন্তু দুই ভাইয়ের যৌথ ভবিষ্যৎ শেষ হলো। এখন সেই রেখার ভেতরে মানুষ জড়ো করতে হবে, শাসনের ভিত্তি তৈরি করতে হবে এবং পরিবার গড়ার সুযোগ দিতে হবে। রোমুলাস একটি নগরের কর্তৃত্ব অর্জন করেছেন; তাকে স্থায়ী সমাজে পরিণত করার সংগ্রাম তখনো সামনে, আর প্রতিবেশী সাবাইনদের সঙ্গে সংঘাত সেই সংগ্রামকে নতুন দিকে নিয়ে যাবে।