বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি

লেখক: খোকা বাবু

ধরন: রহস্য, ড্রামা

অধ্যায় ৯ : অসমাপ্ত ডায়েরি

পৃষ্ঠা 9 / 25

সন্ধ্যার পর সোহান আলমারির নিচের প্যানেলটা আবার খুলল।
গতবারের মতোই ভেতরে হাত ঢোকাতেই তার আঙুল কাঠের গায়ে লেগে গেল। আলগা করে রাখা ফাঁকটা থেকে খাতা বেরিয়ে এল। চামড়ার মলাট, ধুলো, আর পুরোনো কাগজের গন্ধ। করিম চাচা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেন না। মেহরিন জানালার ধারে, অর্ণব চেয়ারে হেলান দিয়ে।

সোহান খাতাটা খুলল।

প্রথম পাতায় কিছু লেখা নেই।
দ্বিতীয় পাতায়ও না।
তৃতীয় পাতায় একটা ছোট লাইন।

আজ বৃষ্টি হলো।

তারপর আর কিছু না।

সোহান পরের পাতায় গেল।

সোহান আবার জানালার পাশে।

মেহরিন একবার মাথা তুলল।
অর্ণব ফিসফিস করে বলল, “বাবা দেখছি নোট রাখতেন।”

কেউ জবাব দিল না।

আরেক পাতা।

মেহরিন গান করছিল।

এখানে এসে মেহরিনের চোখ একটু স্থির হলো।
সে কিছু বলল না।
শুধু জানালার বাইরে তাকাল।

আরেক পাতা।

অর্ণব আজ খুব হাসল।

অর্ণব নাক দিয়ে হালকা শব্দ করল।
“ভালোই।”

সোহান পাতাগুলো একের পর এক উল্টাতে লাগল।
বেশির ভাগ পাতাই ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ।
কখনো আবহাওয়া।
কখনো বাড়ির শব্দ।
কখনো কারও হাঁটার ভঙ্গি।
কখনো কারও নীরবতা।

জবা গাছে পানি দেওয়া হলো।

ঘড়িটা আজও চলছে না।

মা চুপচাপ বসে ছিল।

সন্ধ্যায় আলো কমে এলো।

খাতাটা পড়তে পড়তে কেউ কথা বলল না।
খাতার ভাষা এমন নয় যে সবাইকে একসঙ্গে ধরে ফেলবে।
এটা থেমে থেমে চলে।
যেন কেউ লিখতে চাইছে, কিন্তু মন পুরোপুরি দিচ্ছে না।

এক জায়গায় সোহান থামল।

আজ ওকে দেখলাম।

এর নিচে কিছু নেই।
নাম নেই।
বাক্য নেই।
কারণ নেই।

মেহরিন খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ল।
“এখানে আর কিছু নেই?”

সোহান পাতাটা উল্টাল।
পরের পাতাও ফাঁকা না, কিন্তু তাতে শুধু একটা শব্দ।

আবার।

অর্ণব ভ্রু কুঁচকে বলল, “কাকে দেখলেন, সেটা কী এখনো বলা হবে না?”

সোহান মাথা নাড়ল। “না।”

আরেক পাতায় লেখা—

ও আবার হাসল।

এরপর বেশ কিছু পাতায় কোনো নাম নেই।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
শুধু ছোট ছোট নোট।

রমজান আজ অদ্ভুতভাবে তাকাল।

চা ঠান্ডা হয়ে গেল।

মা কিছু বুঝল না কি?

আজ আর লিখতে পারছি না।

শেষ লাইনটা পড়ে সোহান থামল।

মেহরিন ধীরে বলল, “বাবা নিজের জন্যই লিখতেন মনে হচ্ছে।”

করিম চাচা এতক্ষণ পরও কোনো কথা বললেন না।
শুধু খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার মুখ দেখে বোঝা গেল না তিনি চিনলেন কি না, বুঝলেন কি না, বা কিছু মনে পড়ল কি না।

সোহান আবার পাতায় গেল।

এক জায়গায় কালি একটু ছড়িয়ে গেছে।
পাতার নিচে ভাঁজ পড়া।

আজও বলতে পারলাম না।

এই একটি লাইন পড়েই ঘরে একটু অন্যরকম নীরবতা নেমে এলো।

অর্ণব আস্তে বলল, “এটাই তো সবচেয়ে বেশি বলে।”

সোহান আরেকটু উল্টাল।
এক পাতায় লেখা ছিল—

আজ ও কিছু বলল না।

এর নিচে দাগ কাটা।
পরের শব্দ লেখা হয়নি।

মেহরিন নিচু গলায় বলল, “বাবা কি কেবল দেখতেন?”

সোহান উত্তর দিল না।

শেষের দিকের পাতাগুলো আরও ছোট।
কিছু লেখা একেবারে অসমাপ্ত।

আজ...

পরের শব্দ নেই।

ওর হাতে বই...

তারপর কাগজ ছেঁড়া।

আমি হয়তো...

এর পর কিছুই না।

সোহান একে একে পাতা উল্টে গেল।
প্রতিটা পাতায় যেন না-বলা কথার একটা ভার আছে।

এক জায়গায় সে থামল।
সেখানে লেখা—

আমি যা লিখিনি, তার চেয়েও বেশি কিছু রেখেছি না-লেখায়।

মেহরিন খুব আস্তে পড়ে শুনল।
কথাটা ঘরের ভেতর ছোট হয়ে যায়নি।
বরং বড় হয়ে রইল।

সোহান পাতাটা ধরে রাখল।
আরেকটু সামনে গেল।

শেষ পাতাগুলোতে মাত্র কয়েকটি লাইন।

আজ ও চলে গেল।

এর নিচে কিছু নেই।

ওর পা-র শব্দ আজও কানে আছে।

তারপর ফাঁকা।

খাতার শেষ পাতায় একটি লাইন।

আজ আর লিখতে পারছি না।

সোহান সেখানে এসে থামল।

কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
করিম চাচা খাতার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন।
অর্ণব চেয়ারে পিছিয়ে বসল।
মেহরিন জানালার কাচে অল্প আঙুল ছুঁয়ে রইল।

সোহান খাতাটা বন্ধ করল না।
শুধু খোলা রেখেই ধীরে বলল, “বাবা সব লিখে যাননি।”

মেহরিন বলল, “না।”

অর্ণব জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “বেশির ভাগই বোধহয় বলেননি।”

করিম চাচা এইবারও কিছু বললেন না।

সোহান খাতাটাকে বুকের কাছে চেপে ধরল না।
শুধু হাতে ধরে রইল।
যেন এটা এখন আর ডায়েরি না, বরং এমন একটা জায়গা, যেখানে বাবার না-বলা কথাগুলো বসে আছে।

ঘরের ভেতরে তখন আর কোনো শব্দ নেই।
শুধু পাতার ভাঁজ, কাঠের ঘর, আর এমন এক নীরবতা—যেটা কিছুই বলে না, কিন্তু অনেক কিছু দেখিয়ে দেয়।