চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ৭ : সাদা শাড়ির নারী
সন্ধ্যা নেমে এসেছিল অনেক আগেই।
তৃতীয় তলার ঘরটায় আলো কম, জানালার বাইরে অন্ধকার জমে আছে। বাক্সটা খোলা, খামগুলো সারি করে রাখা। খাম নম্বর ৭ খুলেছিল সোহান।
ভেতর থেকে একটি ছবি বেরিয়ে এল।
চিঠি নয়, নোট নয়—ছবি।
ছবিটা একটু পুরোনো। ধারগুলো কুঁচকে গেছে।
আব্দুল কাদের সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে একজন নারী।
নারীর পরনে সাদা শাড়ি।
শাড়িটা খুব সাধারণ। পাড় নেই বললেই চলে। বহুবার ধোয়া হয়েছে কি না বোঝা যায় না, কিন্তু তার সাদা রংয়ে একধরনের নীরবতা আছে। নারীটি ছবির ভেতরে সোজা দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে হাসি নেই। চোখে এমন কিছু আছে, যা ঠিক নাম দেওয়া যায় না।
মেহরিন প্রথমে ছবিটা হাতে নিল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “এই নারীকে আমি চিনি না।”
অর্ণব একটু ঝুঁকে দেখে বলল, “মায়ের বান্ধবী?”
সোহান কিছু বলল না।
সে শুধু ছবিটার পেছনটা উল্টে ধরল।
পেছনে আব্দুল কাদের সাহেবের হাতের লেখা।
একটি বাক্য—
“যদি তাকে খুঁজতে যাও, খুব সাবধানে যেও।”
ঘরে এক মুহূর্ত কিছু হলো না।
তারপর মেহরিন চুপচাপ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
অর্ণব বলল, “তাকে মানে কাকে?”
কেউ জবাব দিল না।
করিম চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ছবিটা দেখেই তাঁর চোখ একটু স্থির হয়ে গেল।
সোহান সেটা দেখল।
“চাচা,” সোহান বলল, “এই নারীকে চিনতেন?”
করিম চাচা একটু থেমে বললেন, “মনে নাই, বাবা।”
অর্ণব ভ্রু তুলল। “মনে নাই?”
“বয়স হলে অনেক কিছু মনে থাকে না,” করিম চাচা বললেন।
মেহরিন ছবির নিচের কোণায় আঙুল বুলাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।
কোথাও যেন খুব ছোট একটা অক্ষর দেখা যাচ্ছে।
অস্পষ্ট।
একটু ছেঁড়া।
কিন্তু মনে হলো, সেখানে কোনো নামের শেষাংশ ছিল।
সে ছবিটা আরও কাছে এনে বলল, “এখানে কিছু লেখা আছে।”
সোহান ঝুঁকে দেখল।
অক্ষরগুলোর একাংশ মুছে গেছে।
শুধু শেষের দিকে একটা টুকরো—
“…র্ণা”
অর্ণব বলল, “এটা কী?”
মেহরিন কাঁধ নাড়ল। “জানি না।”
ছবিটা টেবিলের ওপর রাখল সে।
তারপর অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
করিম চাচা ধীরে বললেন, “আপনার আব্বা ছবিটা মাঝে মাঝে দেখতেন।”
“কবে?” সোহান জিজ্ঞেস করল।
“রাতে।”
“এই ঘরে?”
“জি।”
“কাউকে দেখাতেন?”
করিম চাচা মাথা নাড়লেন। “না।”
অর্ণব হাসল, কিন্তু হাসিতে স্বস্তি নেই।
“বাবার রহস্যের খাতা দেখি আরও বড় হচ্ছে।”
মেহরিন কটমট করে তাকাল।
“চুপ কর।”
সে ছবিটা আবার হাতে নিল।
সাদা শাড়ির নারীটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “না… এটা মা না।”
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
মেহরিন একটু থমকে গেল।
তারপর বলল, “জানি না।”
সোহান ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছু লোককে দেখলে মনে হয়, তারা চেনা।
আবার কিছু মুখ দেখে মানুষ নিজের ভেতর অচেনা একটা অস্বস্তি অনুভব করে। এই নারীটা দ্বিতীয় দলে পড়ে। খুব কাছে নয়, তবু একেবারে দূরেও নয়।
করিম চাচা আবার বললেন, “আপনার আব্বা ওইদিকে বেশি যেতেন না।”
“কোনদিকে?” অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
“ওই… ওনার কাগজপত্রের দিকে।”
কথাটা বেশ স্পষ্ট হলো না।
তবু কেউ আর জিজ্ঞেস করল না।
ছবিটা টেবিলে পড়ে রইল।
সাদা শাড়ির নারী, আব্দুল কাদের সাহেবের পাশে, আর পেছনে সেই সাবধানবাণী।
এই একটুকরো ছবি ঘরের ভেতর পুরোনো ধুলোর সঙ্গে মিশে গেল।
মেহরিন খুব আস্তে বলল, “বাবা তাকে চিনতেন।”
সোহান মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
অর্ণব জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর আমাদের বলেননি।”
এরপর কেউ আর কিছু বলল না।
শুধু ছবিটা টেবিলের ওপর রইল।
আর ছবির ভেতর অচেনা সেই নারী, যার নাম এখনো পুরোটা প্রকাশ পায়নি—শুধু একটি অসম্পূর্ণ শব্দের শেষ অংশ রয়ে গেছে।