চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ৫ : না-পাঠানো চিঠি
খাম নম্বর ৫ খুলতে গিয়ে মেহরিনের হাত একবার থেমেছিল।
তৃতীয় তলার ঘরটায় তখন বিকেলের আলো কমে এসেছে। জানালার ধারে পাতলা সোনালি রেখা, বাক্সটা খোলা, আর খামের ভেতর থেকে বেরোনো কাগজের গন্ধ। সোহান চেয়ারে বসে ছিল। অর্ণব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। করিম চাচা দরজার কাছে নিঃশব্দ।
মেহরিন খামটা খুলে ভেতরের চিঠিটা বের করল।
কাগজের ওপরে ছোট করে লেখা—
“আরিফকে”
লেখাটা মেহরিনের হাতের।
চিঠিটা সে পড়তে শুরু করল।
“আরিফ,
আমি জানি, এই চিঠি তোমার কাছে কখনো পৌঁছাবে না।
তবু লিখছি।
কারণ কিছু কথা মাথার ভেতর থেকে বের হতে চায় না।”
সে একটু থামল।
তারপর আবার পড়ল।
“আজ বিকেলে তুমি বললে, আমি খুব চুপচাপ থাকি।
আমি কিছু বলিনি।
কারণ তুমি জানো না, আমি চুপচাপ থাকি শুধু তোমার সামনে।”
অর্ণব খুব ক্ষীণ একটা হাসি দিল।
“ভালোই ছিল,” সে বলল। “চিঠিটা একেবারে ভারী হয়ে ওঠেনি।”
মেহরিন তাকাল না।
শুধু পড়তে থাকল।
“তুমি যখন তাকাও, মনে হয় আমি যা বলব, তা তুমি আগেই বুঝে গেছ।
এটা ভালো লাগে।
আবার ভয়ও লাগে।”
সোহান বলল, “চালিয়ে যা।”
মেহরিন পড়ল।
“তোমার সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, আমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারত।”
কাগজের ওপর তার আঙুল শক্ত হয়ে উঠল।
“আমার বাড়িতে কেউ খুব একটা কথা শোনে না।
আমি বলছি না, তারা শুনতে চায় না।
হয়তো তারা জানেই না, কাকে কীভাবে শুনতে হয়।”
সে আরেকটু নিচে গেল।
“আমি একটা ছোট ঘর চাই।
একটা জানালা।
আর জানালার পাশে একটা চেয়ার।
কেউ যদি বই পড়ে, আমি পাশে বসে শুনব।”
অর্ণব একবার নিজের মুখের দিকে হাত দিল।
“এই জানালা-চেয়ার-টেয়ার ব্যাপারটা আমাদের বাড়ির লোকজনের খুব প্রিয় হয়ে যাচ্ছে।”
মেহরিন এবার মুখ তুলে তাকাল।
“চুপ কর।”
সে আবার পড়ল।
“আরিফ,
আমি খুব সাধারণ একটা জীবন চাই।
এতে লজ্জার কিছু নেই।
আমি এমন একটা জীবন চাই, যেখানে আমাকে খুব বড় কিছু প্রমাণ করতে হবে না।”
এই লাইনে এসে মেহরিন থামল।
তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য কাঁপল।
“তুমি হাসলে কেমন দেখাও, সেটা আমি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
তবু বুঝতে চাই।”
কিছুক্ষণ ঘরে শুধু পাতার শব্দ, আর নিচতলার দূরের পায়ের আওয়াজ।
তারপর মেহরিন নিচের অংশে গেল।
“আমি এই চিঠিটা পাঠাইনি।
কারণ সেদিন বাবা আমার ঘরে ঢুকেছিলেন।”
সোহান মাথা তুলল।
অর্ণবও জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরল।
মেহরিন পড়ে গেল—
“তিনি কিছু বলেননি।
শুধু টেবিলের ওপর রাখা বইটার দিকে তাকিয়েছিলেন।
আমি চিঠিটা ওই বইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে রেখেছিলাম।
বাবা বইটা তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
এখানে এসে তার কণ্ঠ একটু ভেঙে গেল।
“আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
কারণ তখন মনে হয়েছিল, বোধহয় এটাই ভালো।
কিন্তু সেই দিনের পর থেকেই বুঝতে শুরু করেছি—কিছু না-বলা কথারও একটা দাম আছে।”
ঘরে নীরবতা জমে রইল।
অর্ণব একপাশে তাকিয়ে বলল, “বাবা বইও নিয়ে যেতেন?”
মেহরিন কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল, “হয়তো শুধু বই না।”
সে আবার পড়ল।
“তুমি যদি কখনো জানতে পারো, আমি এই চিঠি পাঠাইনি, তাহলে রাগ কোরো না।
আমি আসলে ভয় পেয়েছিলাম।
ভয় পেয়েছিলাম, তুমি পড়বে না।
আর না-পড়ার চেয়ে বড় ভয় ছিল—তুমি বুঝবে, কিন্তু কিছু বলবে না।”
সোহান ধীরে বলল, “তোর আর কিছু আছে?”
মেহরিন মাথা নাড়ল। “না।”
কাগজের শেষ অংশে ছোট করে লেখা ছিল:
“যদি কখনো এই চিঠি কেউ পড়ে, বুঝবে—কিছু জীবন শুধু বাঁচা হয় না।
কিছু জীবন থেমে-থেমে লেখা হয়।”
মেহরিন থামল।
আরিফের নামের নিচে তার নিজের অক্ষরগুলো যেন হঠাৎ অন্য কারও হয়ে গেছে।
সে চিঠিটা ভাঁজ করল না।
শুধু দুই আঙুলে ধরে রইল।
তারপর খামের ভেতর আবার ঢুকিয়ে দিল।
অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “এই লোকটা কে ছিল?”
মেহরিন উত্তর দিল না।
সে শুধু জানালার বাইরে তাকাল।
বাইরে জবা গাছটা নড়ছে।
সোহান ধীরে বলল, “বাবা চিঠিটা পেয়েছিলেন।”
মেহরিন মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। বইয়ের ভেতর থেকে।”
করিম চাচা তখনই খুব আস্তে বললেন, “সেই বইটা আমি একদিন আলমারিতে দেখেছিলাম। আপনার আব্বা পরে সেটাকে আর বের করেননি।”
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
তিনি আর কিছু বললেন না।
মেহরিন চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
কিছুক্ষণ পরে সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন এই অক্ষরগুলো তার নয়, বহু আগের এক মেয়ের, যে আর কোথাও নেই।
সোহান কিছু বলল না।
অর্ণবও না।
শুধু খাম নম্বর ৫ টেবিলের ওপর পড়ে রইল।
আর তার পাশে মেহরিনের না-পাঠানো চিঠি—যেটা কোনোদিন আরিফের কাছে পৌঁছায়নি, কিন্তু আব্দুল কাদের সাহেবের নীরব হাতে পৌঁছে গিয়েছিল।