চাঁদের আলোয় তৃতীয় বাড়ি
অধ্যায় ১৪ : অপূর্ণ ভালোবাসা
সেবার শীত ছিল।
শহরের বাতাসে ধুলোর সঙ্গে একটা কাঁচা ঠান্ডা মিশে ছিল। রাস্তায় হাঁটলে গায়ে লাগত, আবার খুব বেশি কষ্টও দিত না—ঠিক যে ধরনের আবহে কিছু মানুষ প্রথমবার একে অপরকে মনে রাখতে শুরু করে।
আব্দুল কাদের তখন আর এখনকার মানুষটি নন।
চোখে ছিল তীক্ষ্ণতা, কাঁধে ছিল তারুণ্যের কড়া ভর, আর মুখে এমন এক নীরবতা যা তখনও অভ্যাস হয়ে ওঠেনি। তিনি বেশি কথা বলতেন না, কিন্তু তখনো তাঁর চুপ থাকা মানে এই ছিল না যে তিনি সব শেষ করে ফেলেছেন। বরং অনেক কিছু এখনো শুরুই হয়নি।
সুবর্ণাকে তিনি প্রথম দেখেন লাইব্রেরিতে।
সে দিনের কথা কাদের পরে খুব অল্প লিখে রেখেছিলেন।
ডায়েরিতে শুধু ছিল—
আজ একজন মেয়ে বইয়ের পাতার ভাঁজ ঠিক করে রাখছিল।
এর বেশি কিছু না।
কিন্তু ওই একটা লাইনই তখনকার তরুণ কাদেরের জীবনে ছোট্ট এক ফাটল ধরিয়েছিল।
সুবর্ণা খুব উজ্জ্বল ছিলেন না।
তাঁর সৌন্দর্য এমন নয় যে ঘরে ঢুকলেই সবাই তাকায়। বরং তাঁর উপস্থিতি একটু ধীরে ধীরে মনে বসত।
চোখে পড়ত বই ধরা আঙুল, পাতার ওপর থেমে যাওয়া দৃষ্টি, আর কথা বলার আগে একটু সময় নেওয়ার অভ্যাস।
সেদিন কাদের লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে ছিলেন।
হাতে একখানা ইতিহাসের বই।
উল্টো দিকে সুবর্ণা।
তিনি বইটা বের করছিলেন তাক থেকে, কিন্তু নামের পাশে থেমে গিয়েছিলেন।
“এটা ভালো?” তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন লাইব্রেরিকেই নয়, যেন তাকেই।
কাদের কিছুক্ষণ উত্তর দেননি।
তারপর বলেছিলেন, “ভালো হলে এখানেই থাকত।”
সুবর্ণা একটু হেসেছিলেন।
সেই হাসি বড় কিছু ছিল না।
তবু কাদেরর মনে হয়েছিল, ঘরের ভেতর হঠাৎ আলো একটু বদলে গেল।
এরপর থেকে তিনি প্রায়ই আসতে লাগলেন।
আগে বইয়ের জন্য।
পরে বইয়ের অজুহাতে।
সুবর্ণা বসতেন একই টেবিলে।
জানালার কাছের টেবিলটা।
সেখানে আলো আসত অল্প, কিন্তু ঠিক পড়ত পৃষ্ঠার ওপর।
কাদেরও কখনো কাছের চেয়ারে বসতেন, কখনো দূরে।
কখনো কোনো কথা বলতেন না।
কখনো একেবারে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতেন।
“আপনি একই বই বারবার পড়েন?”
একদিন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন।
সুবর্ণা চোখ না তুলে বলেছিলেন, “না।
কিন্তু কিছু বই বারবার খুলে দেখি।”
“কেন?”
“কারণ ভালো বই বদলায় না।”
কাদের তখন হেসেছিলেন।
“মানুষ?”
“মানুষও বদলায় না,” সুবর্ণা বলেছিলেন।
“শুধু লুকিয়ে যায়।”
এই কথাটা কাদেরের ভেতরে অনেকক্ষণ থেকে গিয়েছিল।
তারা বড় প্রেমের মতো কাছে আসেননি।
দূরত্ব ছিল।
বড় বড় স্বপ্ন ছিল না।
বরং ছোট ছোট উপলব্ধি ছিল।
একজন আরেকজনের বইয়ের ভাঁজ দেখে বোঝার চেষ্টা করতেন মনের অবস্থা।
একজন আরেকজনের নীরবতাকে ভাঙতে চাইতেন না।
চিঠি দিয়ে কথা হতো বেশি।
কথা বলার চেয়ে চিঠি সহজ ছিল।
চিঠিতে থামা যায়।
কাগজে অপেক্ষা করা যায়।
কাদের কখনো খুব দীর্ঘ চিঠি লিখতেন না।
তাঁর চিঠি ছোট, অল্প কথার, কিন্তু ভেতরে একটু কাঁপুনি থাকত।
এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—
তুমি যেদিন বই ফেরত দিতে এলেনা, সেদিন লাইব্রেরির ভেতরটা কেমন ফাঁকা লেগেছিল।
সুবর্ণার উত্তরও এমনই ছিল।
সংক্ষিপ্ত।
নরম।
কিন্তু ভেতরে নিজের মতো শক্ত।
ফাঁকা জায়গা সবসময় এক রকম হয় না।
কিছু ফাঁকা জায়গা মানুষ রেখে যায়।
কিছু ফাঁকা জায়গা মানুষ হয়ে থাকে।
কাদের সেই চিঠি অনেকক্ষণ ধরে রেখেছিলেন।
তাঁর টেবিলের ড্রয়ারে নয়, বুকের কাছে।
পরে জানা গিয়েছিল, সুবর্ণা খুব কম হাঁটতেন।
কিন্তু যখন হাঁটতেন, তখন দ্রুত হাঁটতেন না।
কাদেরও তাঁর সঙ্গে হাঁটতেন।
দীর্ঘ হাঁটা।
কথা কম।
পাশাপাশি রাস্তা।
কোনো দিকেই তাড়াহুড়ো নেই।
শহরের পুরোনো রাস্তা।
দোকানের বাতি।
নিঝুম ফুটপাত।
কখনো নদীর ধারে।
কখনো কলেজের পাশের পিচঢালা পথ।
কথা না বলেও সেখানে একটা সম্পর্ক তৈরি হতো, যেটা প্রতিদিনের মানুষের ভাষায় ব্যাখ্যা করা যেত না।
একদিন সুবর্ণা হঠাৎ বলেছিলেন, “আপনি খুব কম কথা বলেন।”
কাদের তখন হাঁটছিলেন।
“আপনি কি সেটা পছন্দ করেন?”
সুবর্ণা একটু চুপ করে থেকে বলেছিলেন, “না-পছন্দও না।”
কাদের হাসেননি।
শুধু বলেছিলেন, “আমি বেশি বললে, নিজের কথা শুনতে পাই না।”
সুবর্ণা তখন রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
“এটা ভালো,” তিনি বলেছিলেন।
“কিছু মানুষ নিজের শব্দে নিজেই ডুবে যায়।”
কাদেরর মনে হয়েছিল, সুবর্ণা তাঁকে ঠিক মতো দেখছেন।
কিন্তু ভয়ও লাগছিল।
কারণ দেখা মানে সহজ নয়।
দেখা মানে ধরে ফেলা।
লাইব্রেরিতে একসময় তাঁদের জন্য বই আলাদা করে রাখা হতো।
কাদের কখনো আগেই বলে দিতেন, কোন বই দরকার।
সুবর্ণা এসে নিয়ে যেতেন।
কখনো ফেরত দিতে দেরি করতেন।
তখন কাদের আর কিছু বলতেন না।
শুধু পরের বইটা রেখে দিতেন।
বইয়ের আড়ালে, চিঠির নিচে, হাঁটার মাঝখানে, নীরবতার ভেতর—ধীরে ধীরে তাঁদের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেল।
কোনো ঘোষণা ছাড়াই।
কোনো নাম ছাড়াই।
এমনকি নিজেদের কাছেও পরিষ্কার না করে।
একবার সুবর্ণা একটি বইয়ের ভেতর শুকনো শিউলি ফুল পেয়েছিলেন।
তিনি কিছু বলেননি।
শুধু বইটা ফেরত দিয়ে ছিলেন।
কাদের পরে পাতার ভাঁজে একটা ছোট কাগজ পেয়েছিলেন।
ফুলটা রেখে দিলাম।
কারণ বইয়ের ভেতর থেকে কিছু বেরিয়ে এসে থাকলে, সেটা ফেরত দেওয়া যায় না।
কাদের সেই কাগজ অনেকক্ষণ ধরে পড়েছিলেন।
তারপর বুকের ভেতর একটা ছোট, অপরিচিত ব্যথা অনুভব করেছিলেন।
সে ব্যথা আনন্দের ছিল না।
দুঃখেরও না।
বরং একটা অসমাপ্ত জায়গার মতো।
দিনের পর দিন এমনই চলতে লাগল।
কাদের আর সুবর্ণা কাছে এসেছিলেন, কিন্তু পূর্ণতার দিকে যাননি।
কারণ তাঁদের জীবনে আগে থেকেই কিছু ছায়া ছিল।
কিছু দায়।
কিছু না-বলা কথা।
কিছু পারিবারিক টানাপোড়েন।
তবু তাঁদের দুজনের মধ্যে যা ছিল, তা সস্তা ছিল না।
তা ছিল ধীর, সতর্ক, আর খুব ব্যক্তিগত।
কাদের একসময় বুঝেছিলেন, তিনি যে মেয়েটির সঙ্গে হাঁটছেন, তিনি কেবল একজন মেয়ে নন।
তিনি একটা ভিন্ন জগৎ।
যেখানে বই, নীরবতা, আর অসমাপ্ত বাক্য একসঙ্গে বাস করে।
সুবর্ণাও বুঝেছিলেন, কাদেরের নীরবতা শূন্য নয়।
তার মধ্যে ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু জমে আছে।
কিন্তু তিনি সেটাকে ভাঙতে যাননি।
বরং পাশে হেঁটেছেন।
এই প্রেমে খুব বেশি স্পর্শ ছিল না।
খুব বেশি উচ্চারণও না।
কিন্তু একে ছোট বলা যায় না।
কারণ ছোট জিনিসও অনেক সময় মানুষের ভেতর সবচেয়ে গভীর জায়গায় গিয়ে বসে।
একদিন লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার পরও তাঁরা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন।
শীতের বিকেল।
আকাশে মেঘ।
সুবর্ণা হঠাৎ বলেছিলেন, “কিছু মানুষকে চিঠি লিখে বলা যায়।
কিছু মানুষকে বলা যায় না।”
কাদের জানতে চেয়েছিলেন, তিনি কোন দলে পড়েন।
কিন্তু প্রশ্নটা করেননি।
সুবর্ণা তখন নিজেই একটু হেসে বলেছিলেন, “আপনি নিশ্চয়ই না-বলার দলে।”
কাদের সেদিন শুধু উত্তর দিয়েছিলেন, “আপনিও।”
সুবর্ণা আর কিছু বলেননি।
কিন্তু সেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা, সন্ধ্যার আলো, আর বইয়ের গন্ধ—সব মিলিয়ে তাঁদের সম্পর্কের ভেতরে এমন একটা সময় জমতে শুরু করল, যেটা পরে হারালেও পুরোপুরি মুছে গেল না।
ডায়েরিতে কাদের সেই দিনগুলোর কথা খুব অল্প লিখেছিলেন।
সব লেখা ছিল না।
যা ছিল, তা এমন—
আজ সুবর্ণা এসেছে।
বইটা ফেরত দিল।
কিন্তু চোখে যেন কিছু রেখে গেল।
ওর সঙ্গে হাঁটলে রাস্তা লম্বা লাগে।
ভালো লাগে।
কখনো কখনো মনে হয়, কথা না বললেও সম্পর্ক তৈরি হয়।
আবার সেটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
এই সম্পর্ক ছিল না-শেষ হওয়া একটা শুরু।
আর শুরু হতে হতে শেষের ছায়া তখনই পড়তে শুরু করেছিল।
তবে সে ছায়া তখনও স্পষ্ট নয়।
শুধু অনুভব করা যায়।
কাদেরের জীবনেও তখন প্রথমবার এমন কিছু তৈরি হচ্ছিল, যা তিনি কাউকে বলতে পারেননি।
নিজেকেও পুরোপুরি না।
সুবর্ণার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাই প্রেমের গল্প হলেও প্রচলিত প্রেম নয়।
এখানে গোলাপ ছিল না।
ছিল বই।
চিঠি।
নীরবতা।
দীর্ঘ হাঁটা।
আর এমন এক অপেক্ষা, যার নাম কেউ জানত না।
শেষদিকে কাদের এক পাতায় লিখেছিলেন—
যা স্পষ্ট, তা সহজে নষ্ট হয়।
যা অসম্পূর্ণ, তা বেঁচে থাকে বেশি দিন।
তিনি হয়তো তখনই বুঝতে শুরু করেছিলেন, এই ভালোবাসার পরিণতি আর সরল হবে না।
তবু তিনি থামেননি।
কারণ কিছু মানুষ স্পষ্টতার জন্য ভালোবাসে না।
তারা ভালোবাসে অসমাপ্ততার মধ্যে থেকেও পাশে থাকতে।
আর এই গল্পের শুরু ছিল ঠিক সেখানেই।